কয়েকদিনের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যাবে, আর দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হবে নতুন সরকার। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে যাওয়া ক্ষমতার চাবিকাঠি এবার নতুন মুখের কাছে হস্তান্তর হতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। নতুন সরকারের অধীনে আইসিটি থাকবে কি না, এর কাঠামো ও ভূমিকা কী হবে, বিচার প্রক্রিয়া কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে, চিফ প্রসিকিউটর দায়িত্বে থাকবেন কি না—এমন একাধিক প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত আলোচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১০ সালে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার পরিচালনার লক্ষ্যে। যদিও এটি দেশীয় আইনের ভিত্তিতে গঠিত, তবে ট্রাইব্যুনালটি আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারের নীতি ও ধারণার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার দাবি করে আসছে।
ইতোমধ্যে পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল জুলাই আন্দোলনের আলোচিত তিনটি মামলার রায় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এগুলো হলো সুপিরিয়র কমান্ড শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালদের বিচারের রায়, চানখাঁরপুল হত্যাযজ্ঞ মামলা এবং আশুলিয়ার জুলাইযোদ্ধাদের লাশ পোড়ানো মামলা। জুলাইয়ের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলারও সমস্ত বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। রায় যেকোনো দিন দেওয়া হতে পারে।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত দেড় দশকের গুম এবং জুলাই বিপ্লবের হত্যাকাণ্ডে সাবেক ও বর্তমান ২৫ সেনা কর্মকর্তাসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছে, যা ছিল ট্রাইব্যুনালের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। একইসঙ্গে শতাধিক গুম-খুনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধেও বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, জুলাই গণহত্যাসহ বিগত হাসিনা সরকারের গুম-খুনের কয়েকটি মামলার চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রাইব্যুনাল। শাপলা চত্বরে হেফাজতের গণহত্যাসহ অন্যান্য চাঞ্চল্যকর অনেক ঘটনার বিচারও ট্রাইব্যুনালের সামনে রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের ভবিষ্যৎ: থাকবে তো?
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কি আগের মতোই কার্যকর থাকবেÑএটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের সঙ্গে বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। আইসিটিও এর ব্যতিক্রম নয়। ট্রাইব্যুনাল যদি টিকে থাকে, তবে তা কি বর্তমান আইন ও কাঠামোর মধ্যেই চলবে, নাকি সংস্কার আসবে—এই প্রশ্নের উত্তর নতুন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে।
এছাড়া, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর নিজ দায়িত্বে থাকবেন কি নাÑএই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নেতৃত্বে পরিবর্তন মানেই শুধু প্রশাসনিক রদবদল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মামলার গতি, কৌশল ও অগ্রাধিকার। চিফ প্রসিকিউটরের ভূমিকা এখানে কেবল একজন কৌঁসুলি হিসেবে নয়, বরং পুরো বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
এই বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের কয়েকজন প্রসিকিউটরের সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার শাইখ মাহদী বলেন, আইনজীবী বা প্রসিকিউটর হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন নই। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশই জুলাই আন্দোলনের সময়ে পরস্পরের সহযোদ্ধা ছিল এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ বিগত ১৫-১৬ বছরে সংঘটিত অপরাধের বিচার নিয়ে তারা সবাই আপসহীন। দলগুলোর বহু নেতাকর্মী ও সমর্থক সরাসরি ভিকটিম হিসেবে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেছেন, যার বেশকিছু তদন্তাধীন এবং কয়েকটি মামলার বিচার চলছে। সুতরাং, নির্বাচনের পর নতুন সরকারে যারা আসবেন, তারা নিশ্চয়ই নবউদ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে আমি আশাবাদী।
একজন জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সবকিছু বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতাপ্রত্যাশী একটি দলের বক্তৃতায় এমন ইঙ্গিতও মিলছে। তবে এসব শঙ্কার মাঝেও আমরা আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাচ্ছি।
তিনি আরো বলেন, ট্রাইব্যুনালের ভুক্তভোগীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে, নতুন সরকার আসলে ট্রাইব্যুনালকে অকার্যকর করে দিতে পারে। সাক্ষীরা আদালতে বারবার বলেছেন, তারা ন্যায়বিচার পেতে চান এবং তাদের এই প্রত্যাশা সামনে রেখেই আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ স্কলার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, অতীতে সরকার পরিচালনার সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির নজির স্থাপন করেছে। ফলে বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না—এ নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় নির্মোহ অবস্থান, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার ওপরই বিচারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে। পাশাপাশি নির্বাচনের মাধ্যমে যারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করবেন, তারা যদি অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে, বিশেষ কোনো পক্ষকে দায়মুক্তি দেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকেন, তাহলেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।
নীতিগত ও আইনগত পরিবর্তনের প্রভাব
নতুন সরকারের নীতিগত বা আইনগত কোনো পরিবর্তন আইসিটির চলমান মামলা ও কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলতে পারে-এ বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ আইন সংশোধন, প্রসিকিউশন নীতির পরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হলে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের মামলাগুলোর ধারাবাহিকতা ও ন্যায়বিচারের মান রক্ষায় এখানে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
আইসিটির বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে অতীতে দেশ-বিদেশে নানা সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাব, সাক্ষ্য গ্রহণ ও রায়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সমালোচনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে ট্রাইব্যুনাল কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে পারে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। স্বচ্ছ শুনানি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ ও গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকারÑএসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তাজুল ইসলাম কি থাকবেন?
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর। নতুন এ দায়িত্ব নেওয়ার আগে একজন সুপরিচিত আইনজীবী ও মানবাধিকার বিষয়ে সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে আসেন এমন এক সময়ে, যখন আইসিটির বিচার নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সমালোচনা ছিল তুঙ্গে। তার নিয়োগকে একদিকে যেমন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে গতিশীল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে প্রসিকিউশনের সম্পর্ক নিয়েও নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।
এসব বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের আরেকজন প্রসিকিউটর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, চিফ প্রসিকিউটরকে পরিবর্তন করা হতে পারে। এমনটি হলে স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। সে পরিস্থিতিতে আমরা এখানে কাজ চালিয়ে যাব কি না, তা তখন পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আরেকজন জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা আমাদের পছন্দ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের অপেক্ষায় আছি।
এদিকে, তাজুল ইসলাম দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।