হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

অন্তহীন ভোগান্তিতে চিকিৎসাসেবা ম্লান ঢামেক হাসপাতালে

গোলাম মোস্তফা

দেশের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। জরুরি বিভাগের একটু ভেতরে স্ট্রেচার ওঠানামার সিঁড়ি। এই সিঁড়ির দুই পাশে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে আছেন অন্তত ৪৫ জন রোগী। সঙ্গে রয়েছে তাদের স্বজন। নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত একই দৃশ্য। দ্বিতীয় তলায় নিউরো সার্জারি বিভাগে টয়লেটের দুই পাশেও ঠাঁই নিয়েছেন কেউ কেউ।

টয়লেটের নোংরা পানি, ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট, ময়লা-আবর্জনা আর বৃষ্টির পানি মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে তাদের থাকার জায়গা। দুর্গন্ধ, কাদা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যেই চলছে চিকিৎসা আর জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম। দৃশ্যটি দেখে সহজেই মনে হতে পারে, এটি কোনো হাসপাতাল নয়, যেন ময়লার ভাগাড় ।

একই চিত্র শিশু ওয়ার্ডেও। দোতলার ২০৭ নম্বর কক্ষে ১৮ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ১১৫ শিশু, ২০৮ নম্বর কক্ষে ১৯ শয্যার বিপরীতে ৯১ জন এবং ২১০ নম্বর কক্ষে ১৪ শয্যার স্থানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৮২ শিশু। অর্থাৎ প্রতিটি রুমেই শয্যার চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি রোগী ভর্তি। এসব রুমে হাম, নিউমোনিয়া, ডেঙ্গু, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও কিডনিসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে দিশেহারা স্বজনরা।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিদিন এখানে ছুটে আসেন দেশের নানা প্রান্তের হাজারো মানুষ। রোগীর চাপে হাসপাতালের ধারণক্ষমতার চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নেওয়ায় হাসপাতালে প্রতিটি ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। অনেককে মেঝেতে, আবার কাউকে করিডোরে সিঁড়ির অংশে, এমনকি শৌচাগারের পাশে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিছানা ও খাবার রাখার ড্রয়ারে কিলবিল করছে একগাদা তেলাপোকা ও ছারপোকা। থাকতে হচ্ছে ময়লা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশে। বেসিন আর ওয়াশরুমে দুর্গন্ধে টেকা যায় না। নাক-মুখে কাপড় চেপে সেখানে যেতে হয়।

এগুলো যেমন নোংরা, তেমনি ভাঙাচোরা। ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। কোনোটাতে লাইট নেই কিংবা পানি নেই। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে টিস্যু, তুলা, কাগজের টুকরো, পানির বোতল, ময়লাভর্তি পলিথিন ব্যাগ, ফলের খোসা। দেয়ালে কফ, থুতু, পানের পিকের ছোপ। ডাস্টবিনগুলোয় ময়লা-আবর্জনা স্তূপ হয়ে পড়ে রয়েছে। তাতে মশা-মাছি ভনভন করছে। এর মধ্যেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। এছাড়া বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ, টিকিট কাউন্টার এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভোগান্তি তো নিত্যদিনের ঘটনা। অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা। তার মধ্যে রয়েছে দালালচক্রের উৎপাত। তবে কর্তৃপক্ষ বলছেন জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কথা।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রোগী-স্বজনরা বলেন, আমরা গরিব মানুষ, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। টিকিট সংগ্রহ, ডাক্তার দেখানো এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিটি ধাপে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ বেশির ভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনে নিতে হচ্ছে। আর আবর্জনার দুর্গন্ধে পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। নাক-মুখ চেপে হাসপাতালের টয়লেটে গেলে যে কারো বমি চলে আসে। নোংরা, দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে একজন সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ তাদের।

নিউরোসার্জারি বিভাগে দ্বিতীয় তলায় টয়লেটের পাশে থাকা ইসমাইল নামে এক রোগী আমার দেশকে বলেন, এখানে অভিযোগ করেও লাভ দেখি না, অনেকটা মেনেই নিয়েছি। দুর্ভোগ আর ভোগান্তিই যেন আমাদের নিয়তি। পাঁচ বছর আগেও যেমন দেখেছি এখনো তাই দেখছি। সরকার আসে যায় কিন্তু কোনো পরিবর্তন নেই। অনেক উন্নয়নের কথা শুনি, কিন্তু হাসপাতালে এসে সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া পাই না। কষ্ট হলেও চিকিৎসার জন্য এখানেই আসতে হয়, তাই বাধ্য হয়ে সব মেনে নিই।

সিঁড়ির মধ্যে বিছানা পেতে ছেলেকে নিয়ে বসে আছেন শেরপুরের শ্রীবরদীর বাসিন্দা ওমর ফারুক। তিনি আমার দেশকে বলেন, আমার ১৩ বছরের ছেলে আবু হোরায়রার মাথায় সমস্যা। সিট পাইনি তাই এখানে জায়গা দিয়েছে। একটা বিছানার চাদরও দেয়নি। রাস্তার পাশে যেমন ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকে, ছেলে নিয়ে তেমন পরিবেশেই আছি। রাস্তার ওপরে ছাদ নেই কিন্তু এখানে আছে, শুধু এটুকুই পার্থক্য। ডাক্তার কখন আসে, আর কখন যায় কিছুই বুঝি না। এখন পর্যন্ত শুধু ছেলেকে একবার দেখেছে। আর কিছুই বলেনি।

শিশু ওয়ার্ডে ২১০ নম্বর সিটে নিজের শিশুকে নিয়ে ভর্তি দুই মাÑলিমা ও কোহিনূর বেগম। পাশাপাশি থাকার কারণে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, সিটের ডানে-বামে সবদিকেই রোগী। একটু ঘুরে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা নেই। আসলে গরিব মানুষের কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই। নিজেকে আমাদেরও অসহায় লাগে। এমন পরিবেশে বাচ্চার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছি।

শিশু ওয়ার্ডের দায়িত্বরত এক চিকিৎসক আমার দেশকে বলেন, ‘এখানে হাম-ডেঙ্গু-নিউমোনিয়া-সর্দি-জ্বরসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুরা ভর্তি রয়েছে। আমরা জানি হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। অন্য যেকোনো শিশু সংক্রমিত হতে পারে। আবার সিটের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি শিশু ভর্তি। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে অভিভাবকরা রয়েছে। সুতরাং এই ধরনের পরিবেশে রোগ-জীবাণু থেকে সংক্রমণ হতে পারে। এই জীবাণুর সংক্রমণ এত ভয়াবহ যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংক্রমিত হলে রোগীরা আর ভালো হন না। কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই ওই রোগীদের ওপর কাজ করে না। কিন্তু এখানে আমাদের কিছুই করার নেই।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৬০০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন পাঁচ থেকে সাত হাজার রোগী। এর বাইরে বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে প্রায় পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। তাদের মধ্যে জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসায় দিনে ভর্তি হন এক হাজারের বেশি।

হাসপাতালের মেডিসিন, বার্ন বিভাগসহ মোট আটটি আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ইউনিটে শয্যা রয়েছে ১৪০টি। তবে এসব শয্যার চাহিদা এত বেশি যে, একটি বেড খালি হওয়ার অপেক্ষায় গড়ে ৪০ জনেরও বেশি রোগীকে সিরিয়ালে থাকতে হয়। এছাড়া দুটি এমআরআই মেশিনের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় রয়েছে। ফলে একমাত্র সচল মেশিনটির ওপরই পুরো চাপ পড়েছে। এতে প্রতিদিন মাত্র ১৮ থেকে ২০ জন রোগী এমআরআই সেবা পেলেও ১২০ থেকে ১৩০ জনকে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে। আর এই সুযোগে দালাল চক্র টাকার বিনিময়ে আশপাশের ক্লিনিকে রোগীদের ভাগিয়ে নিচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নতুন ভবনে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হওয়া নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আয়েশা বেগম অভিযোগ করে বলেন, আমার ছেলে কিডনি সমস্যায় ভুগছে। চারদিন হলো ভর্তি হয়েছি। দালালরা শয্যা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিল। কিন্তু টাকা দিইনি, তাই পাইনি। তাই মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, দেশের সবচেয়ে বড় এই হাসপাতালে এক্স-রে , ইসিজি, এনজিওগ্রাম যন্ত্র, এমআরআই যন্ত্র, সিটি স্ক্যান, ওটি লাইট (পোর্টেবল), অ্যানেস্থেসিয়া, ডায়াথার্মির মতো প্রয়োজনীয় ১০০টির মতো যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে আছে। এছাড়া হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ছোট-বড় মিলিয়ে তিন শতাধিক অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। তবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক ও শয্যা না থাকায় অপারেশনের জন্য রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

হাসপাতালে রোগীদের ভোগান্তি ও নোংরা পরিবেশের বিষয়ে ঢামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, এখানে শয্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে। আবার একেকজন রোগীর সঙ্গে অ্যাটেনডেন্ট থাকেন চার-পাঁচজন করে। ফলে ভোগান্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক। আবার চিকিৎসক থেকে শুরু করে টেকনোলজিস্ট, নার্সসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে প্রতিদিন নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রাংশের ঘাটতি রয়েছে। তবু আমরা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার করছি।

বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ ১৩ সমঝোতা স্মারক সই

ভিআইপিদের নিরাপত্তা দিলেও কষ্টের জীবন পুলিশের

অন্তহীন ভোগান্তিতে চিকিৎসাসেবা ম্লান ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল

কনডেম সেলে ইবাদত বন্দেগি করে দিন কাটে সেই মিন্নির

সমীক্ষা ছাড়াই বন্ধ বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ, উঠছে প্রশ্ন

ভূমির রাজস্ব কর নির্ধারণে রক্ষকই ভক্ষক

ব্রিটিশ রাজনীতি ও অর্থনীতিকে যেভাবে পঙ্গু করেছে ব্রেক্সিট

তারেক রহমানকে নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের ভিডিও ‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’

তিস্তায় পানির চাপে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত

পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা