প্রয়োজন মূল্যায়ন প্রতিবেদন
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহুল প্রতীক্ষিত ঢাকা-নিউ ইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়া এখন নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিরাপত্তা মূল্যায়নের ওপর। সংস্থাটির সিগনিফিক্যান্ট সেফটি কনসার্ন (এসএসসি)-সংক্রান্ত মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ক্যাটাগরি ওয়ানে উন্নীত হতে পারলেই নিউ ইয়র্ক রুটে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার পথ খুলবে। এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছে সিভিল অ্যাভিয়েশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অডিট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ক্যাটাগরি ওয়ান অর্জন শুধু নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট চালুর জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল খাতে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও ভাবমর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) জানিয়েছেন, নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়া, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অর্জনসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করতে সময় লাগবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৮ সালের শুরুতে ঢাকা-নিউ ইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সবকিছুই নির্ভর করছে আইকাওর অডিটের ওপর।
২০২৬ সালে প্রি-অডিট, ২০২৭ সালে চূড়ান্ত পরীক্ষা
সূত্র জানায়, আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত আইকাওর সার্বজনীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা কর্মসূচি ‘অবিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি’ অনুষ্ঠিত হবে। বিশেষ এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর বিমানবন্দর এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কতটা নিরাপদ তা এককালীন না দেখে, বরং ধাপে ধাপে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা।
তারা একটি প্রি-অডিট মিশন হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করবে। সেই মূল্যায়ন থেকেই বোঝা যাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা তদারকি মান পূরণে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দেবে দেশটি এসএসসি বা গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগের ঝুঁকিতে রয়েছে কি না। এরপর ২০২৭ সালে অনুষ্ঠিত হবে আইকাওর চূড়ান্ত যাচাই পরীক্ষা। এর ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের ক্যাটাগরি ওয়ান অর্জন এবং বিমানের ঢাকা-নিউ ইয়র্ক ফ্লাইটের ভবিষ্যৎ।
প্রস্তুতির ৮০ শতাংশ সম্পন্ন
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সার্বিক প্রস্তুতির প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করতে অত্যাধুনিক এক্স-রে মেশিন, উন্নত স্ক্যানারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট (এফএটি) ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সরঞ্জামগুলো আগস্টে দেশে পৌঁছাবে এবং ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেবিচক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের আইকাও নিরাপত্তা অডিটে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ছিল ৬৫ শতাংশ। এবার লক্ষ্য ৭৫ শতাংশের বেশি স্কোর অর্জন। এদিকে সর্বশেষ ডিএফটি অডিটে বাংলাদেশ কার্গো নিরাপত্তায় ১০০ শতাংশ এবং যাত্রী নিরাপত্তায় ৯৩-৯৪ শতাংশ স্কোর পেয়েছিল।
কাজ করছে তিনটি কমিটি
গত বছরের নভেম্বর থেকে আইকাও অডিটের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নিরাপত্তার ৯টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ তদারকির জন্য তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিয়মিত গ্যাপ অ্যানালাইসিস, অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঘাটতি পূরণের কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক অডিটের আগে আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে বেবিচক নিজস্ব উদ্যোগে প্রি-অডিট পরিচালনা করবে। এতে সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু অডিট নয়, সক্ষমতারও পরীক্ষা
আইকাও অডিটকে সাধারণ পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। এখানে দেখা হয় কোনো দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বিমান নিরাপত্তা তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো আছে কি না। অডিটে আইন, বিধিমালা, সাংগঠনিক কাঠামো, কারিগরি নির্দেশনা, জনবলের দক্ষতা, সনদ প্রদান ব্যবস্থা, তদারকি কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাসহ আটটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র মূল্যায়ন করা হয়।
এদিকে আইকাও বাংলাদেশের পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা তদারকি অডিট ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ায় কিছুটা সময় পেয়েছে বেবিচক। তবে বিমান চলাচল খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অতিরিক্ত সময় সমস্যার সমাধান নয়; বরং খাতটির দুর্বলতাগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সাবেক বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মফিদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, অডিট পিছিয়েছে মানেই বাংলাদেশ বেশি প্রস্তুত হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। আইকাওর মানদণ্ডও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে অতিরিক্ত সময় পেয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।
তিনি আরো জানান, আইকাও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করে। কিন্তু অনেক সময় প্রশাসনিক পর্যায় থেকে বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে বোঝা হয় না। তার মতে, এই মানসিকতাই এখন অন্যতম বড় বাধা।
পরিদর্শক সংকট বড় চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টদের মতে, বেবিচকের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম হলো ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর (এফওআই) সংকট। অন্তত আটজন পরিদর্শক প্রয়োজন হলেও বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র দুজন।
কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন, একজন অভিজ্ঞ পাইলট বাণিজ্যিক এয়ারলাইনসে চাকরি করে মাসে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা আয় করতে পারেন। অথচ বেবিচকে পরিদর্শক হিসেবে ভাতা মাত্র এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। ফলে দক্ষ পাইলটরা এ দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হন না।
বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা যোগ্য পরিদর্শক নিয়োগ এবং তাদের ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছি। অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ফ্লাইট পরিদর্শক তৈরি করতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তাই এই ধরনের জনবল গড়ে তোলার পরিকল্পনাও দীর্ঘমেয়াদি হওয়া উচিত।
আইনি স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন
জনবল ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান চলাচল আইন, ২০১৭ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অডিট প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বেবিচকের যে মাত্রার স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন, বর্তমান আইনে তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। আইনের কিছু ধারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখে। অথচ আইকাও চায় নিরাপত্তা ও কারিগরি সিদ্ধান্তগুলো বাহ্যিক প্রভাবমুক্তভাবে নেওয়া হোক।
এসএসসি হলো আইকাওর সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা সতর্কতার একটি। কোনো দেশ কার্যকর নিরাপত্তা তদারকিতে ব্যর্থ হলে এই পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়। এই ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় না। তবে এর প্রভাব ব্যাপক হতে পারে। এর ফলে নতুন কোডশেয়ার বা বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব কঠিন হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি বীমা প্রতিষ্ঠান ও উড়োজাহাজ লিজদাতারাও ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।
সাবেক বেবিচক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমানের মতে, বাংলাদেশ ব্যর্থ হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে দেশের ভাবমূর্তির। এতে বিদেশি এয়ারলাইনস বাংলাদেশের বাজার নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে পারে এবং আঞ্চলিক অ্যাভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান
অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষক এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, আইকাও কাউকে ফেল করাতে আসে না; তারা দেখে একটি দেশ নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করছে। তাই দ্রুত জনবল সংকট দূর, প্রয়োজনীয় পরামর্শক নিয়োগ, অভ্যন্তরীণ অডিট জোরদার এবং এয়ারলাইনসসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে প্রস্তুতি প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বেবিচকের মুখপাত্র কাউছার মাহমুদ এ বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, ডিএফটি ও আইকাও অডিট সামনে রেখে জোর প্রস্তুতি চলছে। প্রস্তুতির অগ্রগতি প্রায় ৮০ শতাংশ। প্রতি মাসে সদস্যের (সিকিউরিটি) নেতৃত্বে অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা এবং প্রতি দুই মাস অন্তর চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে সমন্বয় সভা হচ্ছে। যেখানে প্রস্তুতির অগ্রগতি মূল্যায়ন, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক এই দুটি অডিটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) নিয়মিতভাবে প্রস্তুতির অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পরপর মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে প্রস্তুতির অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, চলমান প্রস্তুতি, আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংযোজন এবং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের তদারকির ফলে আসন্ন ডিএফটি ও আইকাও অডিটে বাংলাদেশ ভালো ফল করবে। এতে দেশের বিমানবন্দরগুলোর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং বৈশ্বিক বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে।