দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৌশলগত অংশীদারত্ব নতুন উচ্চতায় নিতে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার। চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বলেছেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরে বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন। দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এসব স্মারক সই হয়।
সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক বিষয় অনুবিভাগের মহাপরিচালক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দুদেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে একযোগে কাজ করার ব্যাপারে একমত হন দুই প্রধানমন্ত্রী।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়ভাবে ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণ করে এবং ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে চীন যে মূল্যবান সহায়তা দিয়ে আসছে, তার জন্য বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ। চীনের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে এবং দুদেশের উন্নয়ন কৌশলের মধ্যে আরো সমন্বয় জোরদার করতে আগ্রহী।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। একই সঙ্গে মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের ধারণা এবং চীনের প্রস্তাবিত চারটি প্রধান বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশ উচ্চমাত্রার সমর্থন ও সম্মতি জানায়। তিনি বলেন, বহুপক্ষীয় বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।
এদিকে চীনের প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেছেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কৌশলগত পারস্পরিক আস্থা আরো সুদৃঢ় করতে, বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে এবং দুই দেশের জনগণের জন্য আরো বেশি কল্যাণ নিশ্চিত করতে চীন প্রস্তুত রয়েছে। চীন ও বাংলাদেশ ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বে আবদ্ধ ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। বাংলাদেশের জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নপথ অনুসরণ এবং নতুন সরকারের শাসন কার্যক্রমে চীন দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
তিনি বলেন, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে দুদেশ কৌশলগত আস্থা আরো গভীর করবে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে একযোগে কাজ করবে। এর মাধ্যমে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন ও বৃহত্তর উচ্চতায় পৌঁছবে এবং উভয় দেশের জনগণ উপকৃত হবে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) সহযোগিতা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি মানসম্পন্ন পণ্য আমদানিতে আগ্রহী চীন। একই সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ উদীয়মান খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বহুপক্ষীয় অঙ্গনে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে লি কিয়াং বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঐক্য ও আত্মনির্ভরতা জোরদার এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর যৌথ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চীন ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের পাশে থেকে চীন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চীন আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের জন্য বাংলাদেশের আবেদনকে স্বাগত জানায়। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। এ সংকট সমাধানে আমাদের বহুপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাও প্রয়োজন। চীনের প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা সর্বদা ইতিবাচক সহযোগিতার পক্ষে থাকবেন। এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও সহায়তা করবেন এবং এ সংকটে তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করবেন।
তিনি আরো বলেন, তারা অত্যন্ত আশাবাদী যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী তারেকের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যৌথ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির রূপরেখা চীনের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উভয় নেতা একমত হয়েছেন, এটি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন ভোরের সূচনা করবে এবং একটি ব্যাপক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব গঠিত হবে, যার আওতায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সব ক্ষেত্রে ও খাতে সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
উপদেষ্টা বলেন, বেইজিংয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠক এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটিই প্রমাণ করে, বিশ্ব এবং বিভিন্ন বিশ্বনেতারা এখন নেতৃত্বের জন্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কূটনীতি ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা কৌশলগত ও সহযোগিতামূলক বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের জন্য এক নতুন বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এমন একজন প্রভাবক হিসেবে দেখা হয়, যিনি বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর জনগণের মঙ্গলের জন্য আঞ্চলিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, ১৩টি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যাডিংয়ের (এমওইউ) মধ্যে রয়েছে—ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন কীভাবে আমরা গ্রিন ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রমোট করতে পারি, এক্ষেত্রে জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যানের বিষয়ে কথা হয়েছে।
বাংলাদেশের এক্সপোর্ট ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে যেন চীনে আমরা রপ্তানি করতে পারি এবং বিভিন্ন ডেভেলপমেন্টাল কো-অপারেশন নিয়ে কথা হয়েছে। কনসেশনাল লোন অর্থাৎ বাংলাদেশে যে ঋণটা চীন থেকে যাচ্ছে, সেখানে কীভাবে আমরা ইন্টারেস্ট রেট কমাতে পারি, গ্রেস পিরিয়ড বাড়াতে পারি—সেটি নিয়ে কথা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, অর্থাৎ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক অ্যালাইনমেন্ট রিলেটেড, ম্যানপাওয়ার ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট রিলেটেড যে কাজগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে এমওইউ হয়েছে। একই সঙ্গে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের একটা ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্ল্যান সাইন করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল রপ্তানি বিষয়ে একটা এমওইউ হয়েছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, একই সঙ্গে চীনের ভাষা ম্যান্ডারিন বাংলাদেশে আমরা শুরু করতে যাচ্ছি, আমাদের স্কুল কারিকুলামে সেটি এবং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনে কো-অপারেশনে দুটো পৃথক এমওইউ হয়েছে। তিনি বলেন, মিডিয়ার ক্ষেত্রে কীভাবে দুদেশের কোলাবোরেশন বাড়ানো যায়, থিংক ট্যাংক ফোরাম নিয়ে আমরা কীভাবে সামনের দিকে আগাতে পারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেল এবং নিউজ পেপারের ভেতরে চারটা এমওইউ হয়েছে।
বিনিয়োগসংক্রান্ত সমঝোতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বোর্ড বিডার সঙ্গে এবং এর পাশাপাশিভাবে পৃথকভাবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং মোংলায় কীভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, সেখানে ইকোনমিক জোন দিয়ে কীভাবে বাংলাদেশে নতুন চীনা ফ্যাক্টরি, চীনা প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি এবং তার মাধ্যমে এমপ্লয়মেন্ট জেনারেট করতে পারি, সেগুলো নিয়ে পৃথক এমওইউ হয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে ব্যাংকুয়েটে দেওয়া চীনা প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে সকালে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’-এ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এ সমঝোতায় সই করেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং।
সমঝোতার আওতায় দুদলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা লিউ হাইসিং। বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রেট হল অব পিপলে পৌঁছান। সেখানে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।
গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। গতকাল বিকালে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রেট হলে এসে পৌঁছলে চীনের প্রধানমন্ত্রী তাকে স্বাগত জানান।
শুভেচ্ছা বিনিময় ও দুদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় পর্বের পর প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি কিয়াং। অভিবাদন মঞ্চে তারেক রহমান ও লি কিয়াংকে সশস্ত্র সালাম দেয় চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল। এ সময় দুদেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেওয়া হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন।
চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বেইজিংয়ের একটি হোটেলে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের মূল্যশৃঙ্খল বাংলাদেশে সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আমরা চীনা কোম্পানিগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে আরো কার্যকরভাবে সেবা দিয়ে সহায়তা করতে পারি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আপনাদের এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ের অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে বহু চীনা বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তারা আমাদের জনগণের কর্মক্ষমতা, আমাদের সহনশীলতা এবং আমাদের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে পারেন। তারা বলতে পারেন ‘বাংলাদেশ সফল হতে পারে’।
তারেক রহমান আরো বলেন, বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার জন্য আরো বেশি চীনা কোম্পানির দেশটিতে আসা উচিত। তিনি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, তাদের বিনিয়োগ যথাযথ মূল্যায়ন পাবে, উদ্বেগ ও প্রত্যাশার বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে এবং আরো গতিশীল ও সংবেদনশীল বিনিয়োগ পরিবেশের মাধ্যমে তাদের প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করা হবে। তিনি বলেন, ‘চীন যখন শিল্প ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের আরো উচ্চ ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন উৎপাদনব্যবস্থার কিছু অংশ নতুন, প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য গন্তব্যের সন্ধান করবে। বাংলাদেশ সে সম্ভাবনাময় গন্তব্যগুলোর একটি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী বৈষম্যহীন সুবিধা, মূলধন ও লভ্যাংশ দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা পাবেন। তিনি বলেন, আমরা চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলছি। এর মধ্যে রয়েছে আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব অঞ্চলে উন্নত লজিস্টিকস সুবিধা, সমুদ্রবন্দর সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবা, দক্ষ শ্রমশক্তি, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প-পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও প্রণোদনা নিয়ে একটি বিশেষ উপস্থাপনা তুলে ধরেন। সম্মেলনে ১২৫ জন চীনা ব্যবসায়িক প্রতিনিধি অংশ নেন।
তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইং। বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায় দুদেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য হয়। গতকাল দুপুরে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় তিয়াওইউথাই অতিথি ভবনে এ বৈঠক হয়।
প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দেশে চলমান নদী খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীন সরকারের সহযোগিতা চান। তিনি বাংলাদেশের তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তা প্রত্যাশা করেন। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এবং গত বছর চীনের পানি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাস্তবভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে চীন সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে। তিনি বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ এবং এ খাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণের আহ্বান জানান। এ সময় চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি বই উপহার দেন।
কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রীর সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং। গতকাল চীনের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় তিয়াওইউথাই অতিথি ভবনে এ সাক্ষাৎ হয়।
বৈঠকের শুরুতে লিউ হাইসিং তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় অভিনন্দন জানান। পাশাপাশি তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নয়বার চীন সফরের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার চীন সফরের ছবি তার সম্মানে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
লিউ হাইসিং বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) কথা উল্লেখ করে দুদলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরো জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের দৃঢ় সমর্থক। পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে দুদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপরও তিনি জোর দেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণে চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। তিনি দুদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান। ওই সফরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে গত সোমবার তিনি পৌঁছান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দালিয়ানে। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে গত বুধবার বিকালে তারেক রহমানের বেইজিংয়ে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফর শুরু হয়। আজ শুক্রবার গ্রেট হল অব পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে। স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা।