বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নানামুখী কৌশলগত এবং কূটনৈতিক তৎপরতা এখন প্রকাশ্য। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে চাইছে দুই পরাশক্তি। এ ক্ষেত্রে চীনের তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতাই অধিক জোরালো।
বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় পৌঁছেই নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন রীতিমতো ব্রিফিং করে জানান, বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, বাংলাদেশে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় আমি বলিষ্ঠভাবে কাজ করব।
নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই মন্তব্যের পর কোনো ধরনের বিলম্ব না করেই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় ঢাকার চীনা দূতাবাস। দূতাবাসের বিবৃতিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দিয়ে বলা হয়, বেইজিং-ঢাকা সম্পর্ককে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তৃতীয় কোনো দেশের নেই। বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই বৈরী মনোভাব আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য নতুন সমীকরণ দাঁড় করিয়েছে। পরিবর্তিত এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সরকার।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে ঠিক কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে, তা সত্যিকার অর্থেই নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের চলমান তৎপরতার মাঝেই দায়িত্ব নিয়েছে নতুন সরকার। বিশ্লেষকদের পরামর্শÑদুই পরাশক্তির ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে কারো পক্ষ নেওয়া যাবে না। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাংলাদেশকে অগ্রসর হতে হবে। কোনো ধরনের কৌশলগত নিরাপত্তা চুক্তি থেকে বাংলাদেশকে বিরত থাকতে হবে। তবে এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সুযোগ হিসেবেও দেখছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক। তারা বলছেন, বিশ্বের প্রধান দুই পরাশক্তি বাংলাদেশকে কাছ পেতে চাইছে, কেউ বিরোধিতা করছে না। এটা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই একটি সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়টি নির্ভর করবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিচক্ষণতার ওপর। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখবে নতুন সরকার।
বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দৃশ্যমান তৎপরতা মূলত শুরু হয় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামরিক সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন, বাংলাদেশের বন্দর ও পানি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হওয়া, সর্বোপরি বিএনপিসহ ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে টেকসই অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় বেইজিং। এ সময় বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা একের পর এক বেইজিং সফর করেন। সর্বোপরি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর ছিল কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে চীনে যান প্রধান উপদেষ্টা। প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিরল সম্মান জানানোর পাশাপাশি দৃঢ় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন জানানো হয়। তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় সার্বিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। মোংলা বন্দর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা হয় চীনকে। ঢাকার পক্ষ থেকে চীনের তৈরি বেশকিছু মাল্টিরোল ফাইটার জেট কেনার প্রস্তাব করা হয়। এসবই ছিল ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৌশলগত পদক্ষেপের অংশ। প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর দুই দেশের অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে নতুন এক মাত্রা যোগ করে। এছাড়া বাংলাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য একটি ত্রিদেশীয় ফোরাম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।
চীনের এসব পদক্ষেপকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনায় নেয় ওয়াশিংটন। ড. ইউনূস সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন থাকার পরও চীন ইস্যুতে ইউনূস সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে দ্বিধা করেনি মার্কিন প্রশাসন। ত্রিদেশীয় ফোরাম গঠনের উদ্যোগের ব্যাপারে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে রীতিমতো ব্যাখ্যা চেয়ে বসেন। বহুল আলোচিত ট্রেড নেগোসিয়েশনে কঠোর অবস্থানে যায় ওয়াশিংটন। নেগোসিয়েশনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয় চীন। চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পাশাপাশি চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয় বাংলাদেশকে। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে চুক্তি করতে না পারলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ শর্ত মেনে নির্বাচনের ঠিক তিনদিন আগেÑ গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে বাণিজ্যের তুলনায় ভূরাজনীতির উপাদানই বেশি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কূটনীতিক এই চুক্তি সম্পর্কে আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে বলেন, এটা একটি ‘ব্যাড ডিল’। এটাকে কোনোভাবেই ভালো চুক্তি বলা যাবে না। কিন্তু এই চুক্তি স্বাক্ষর করা ছাড়া আমাদের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে চুক্তি সই না করলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়ত। ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশও আমাদের মতো এ ধরনের চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই সিনিয়র কূটনীতিক মনে করেন, এই বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অনুভব করছে নানামুখী মার্কিন চাপ। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় তারেক রহমানকে অভিনন্দনপত্র পাঠান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেই অভিনন্দনপত্রে বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আশা করি, আপনি বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখতে আমাকে সাহায্য করবেন।’ এছাড়া বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়টিও তুলে ধরা হয় অভিনন্দনপত্রে।
এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলেন, ‘আমি আশা করি, আপনি নিয়মিত সামরিক চুক্তিগুলো সম্পন্ন করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন, যাতে আপনার সামরিক বাহিনীকে আমেরিকার তৈরি উন্নতমানের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা যায়।’ সর্বোপরি একটি উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার স্বার্থের ওপর বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব নির্ভর করবে বলে অভিনন্দনপত্রে উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অভিনন্দনপত্রকে অস্বাভাবিক আখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে বলেন, এমন অভিনন্দনপত্র আমরা অতীতে দেখিনি। যে ভাষায় এবং যেসব ইস্যু তুলে ধরা হয়েছে, তা কোনোভাবেই অভিনন্দনপত্রের সঙ্গে যায় না। আসলে আগামীতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখতে ঢাকাকে ঠিক কী করতে হবে, সেই নির্দেশনাই দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার চিঠিতে।
বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা আসেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। গত ৩-৫ মার্চ ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানসহ সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন গুরুত্বপূর্ণ এই মার্কিন নীতিনির্ধারক। এসব বৈঠকে আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে কঠোর বার্তা দেন পল কাপুর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমার দেশকে জানিয়েছেন, পল কাপুর বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের কঠোর মনোভাবের কথা জানিয়ে গেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা স্পষ্টÑবাণিজ্য চুক্তিটি যেভাবে সই হয়েছে, সেভাবেই এর বাস্তবায়ন হতে হবে।
এদিকে গত ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। বৈঠকে মার্কিন বোয়িং কোম্পানি থেকে বাংলাদেশ যে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি সম্পন্ন করতে চায় বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রগুলো আমার দেশকে জানিয়েছে। বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার যোগসূত্র রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বেসরকারি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমীন উর রশীদ এবং প্রধানমন্ত্রীর সামরিকবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
এদিকে চীনও বসে নেই। বেইজিং জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। দায়িত্ব নেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। বৈঠকে ঢাকা-বেইজিং দৃঢ় অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক তথাÑ মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করছেন চীনা রাষ্ট্রদূত। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রদূত ওয়েন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ছাড়াও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বেসরকারি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন এবং পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর আমন্ত্রণে আগামী ২৮ এপ্রিল তিনদিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে বেইজিং যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এই সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ চীন সফর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ঢাকা-বেইজিং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি দুদেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে তৎপর হয়েছে চীন। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের বিএনপির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী ১৬-২৪ এপ্রিল চীন সফরে যাচ্ছে। এই সফরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান লিউ হাইশিংসহ অন্য নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করবে বিএনপি প্রতিনিধিদল। বিএনপির প্রতিনিধিদলের সফরকে দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নানামুখী কূটনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে, যা বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূরাজনীতির এই প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখা সহজ কোনো বিষয় নয়। কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পরামর্শ, সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ডিল করতে হবে দুই পরাশক্তিকে। তারা বলছেন, সরাসরি কোনো পক্ষভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই বাংলাদেশের সামনে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য। দুই দেশই তাদের নিজ নিজ এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি এবং চীন তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) সামনে নিয়ে এসেছে। দুই দেশই চাইছে বাংলাদেশকে তাদের বলয়ে নিতে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল সমীকরণ। আসলে দুই পরাশক্তির কারোর এজেন্ডাতেই আমাদের যোগ দেওয়া ঠিক হবে না। তিনি বলেন, প্রথমে আমাদের নিজস্ব স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিতে হবে। দুই দেশের সঙ্গেই আমাদের পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যু রয়েছে। বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি আরো অনেক ইস্যুতে চীনের সঙ্গে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি বাণিজ্য চুক্তি সই করেছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। ভারসাম্য রক্ষার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিছু সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারি। তবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বের জায়গায় আমরা কোনোভাবেই জড়াব না। তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আমরা কোনো পক্ষ নেব না। সাবেক এই কূটনীতিক সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, আমাদের উচিত হবেÑ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেওয়া যে, আমরা এতটুকু করতে পারব, আর বাকিটা করতে পারব না।
বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের জন্য এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে মন্তব্য করে আমার দেশকে বলেন, দুটি দেশই চাচ্ছে বাংলাদেশকে তাদের নিজ নিজ ব্লকে ধরে রাখতে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতি অতীতে অনেক দেশ ফেস করেছে। আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দুই দেশকে ডিল করতে হবে।
তিনি বলেন, কূটনীতিতে দক্ষ একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমরা পেয়েছি। ড. খলিলের পক্ষে দুই দেশের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব বলে আমি মনে করি। যদিও কাজটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
পাকিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে এই বিশ্লেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমরা পাকিস্তান মডেল বিবেচনায় নিতে পারি। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। চীন-পাকিস্তান সম্পর্ককে বলা হয় ‘অলওয়েদার ফ্রেন্ডশিপ’। একই সঙ্গে পাকিস্তান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজার রেখে চলেছে। এমনটি করতে পারলে সেটা আমাদের জন্য সবচেয়ে সহায়ক হবে।
তিনি বলেন, আমরা আসলে কাউকে বাদ দিয়ে চলতে পারব না। তবে চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এম মুনীরুজ্জামান মনে করেন, বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এক ধরনের সুযোগও নিয়ে এসেছে। আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের মুখোমুখি এখন বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নিজ নিজ অবস্থানে কঠোর। তারা এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব ধরে রাখার পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাব বাড়াতে চাচ্ছে। এই দুই পরাশক্তির বিশেষ নজর এখন বাংলাদেশের দিকে। এই পরিস্থিতি নতুন সরকারের সামনে একদিকে যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, আবার সুযোগও বটে। দুই দেশই আমাদের সহযোগিতা দিতে চাইছে। কেউ বলছে না যে, আমরা বাংলাদেশকে সহযোগিতা করব না। চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য বজায় রেখে আমরা কীভাবে এই সহযোগিতা গ্রহণ করব।
তিনি বলেন, কোনো ধরনের সামরিক জোটে যাওয়া যাবে না। কারও সঙ্গেই আমরা কৌশলগত নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করব না। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে ডিল করার ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে হিসাব করে, একই সঙ্গে কথা বলতে হবে মেপে। আমি মনে করি, আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে দুই পরাশক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। তবে এটা নির্ভর করছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন যে টিম সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে, তাদের কর্মদক্ষতা ও বিচক্ষণতার ওপর। তিনি বলেন, সরকারের উচিত হবেÑ এই ইস্যুতে বিরোধী দলের সঙ্গে ঐকমত্য গঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে কাজ করছেÑ এমন থিঙ্ক ট্যাংক, গণমাধ্যম ও স্টেকহোল্ডারদের যুক্ত করা।
এদিকে দুই দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারে জানতে চাইলে আমার দেশকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুরাষ্ট্র। দুই দেশের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা ইস্যু রয়েছে। আমাদের স্বার্থের ক্ষেত্রগুলো দুই দেশে ভিন্ন হতে পারে। আমাদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে আমরা সম্পর্ক বজায় রাখব। তিনি বলেন, আমি আশাবাদী, আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সঙ্গেই আমাদের সুসম্পর্ক ও অংশীদারত্ব বজায় থাকবে।