আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) এই সংসদীয় আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হলেও গত বছরের ৫ আগস্টের পর বদলে গেছে এখানকার মাঠের রাজনৈতিক চিত্র।
হাসিনার শাসনামলে পুরো সময়জুড়ে মামলা-হামলা, জেল-জুলুমসহ নানা প্রতিহিংসার শিকার নির্যাতিত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের রাজনীতিতে নতুন জীবন ফিরে পায়। মনোযোগ দেয় দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে। দুই দলের নেতারা শুরু করেন সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি নিজেদের দখলে নিতে নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে শেখ হাসিনা কিংবা তার দলের কেউ অংশ নিতে না পারলে নির্বাচনি যুদ্ধ হবে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে। কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়া আসনে সরেজমিনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভোটের লড়াই হবে বলে মনে করছেন এ আসনের ভোটাররা। তবে এ আসনটিতে যদি শেখ হাসিনার পরিবর্তে আওয়ামী লীগের কোনো শীর্ষ নেতা দলীয় কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয় তাহলে বদলে যেতে পারে ভোটের এই হিসাব-নিকাশ।
দেশ স্বাধীনের পরে এই আসনটি সবসময়ই আওয়ামী লীগ তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৮৬ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন তিনি দেশের পাঁচটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। একবার উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে লাঙল প্রতীক নিয়ে কাজী ফিরোজ রশীদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে শেখ হাসিনা টানা আটবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এসব নির্বাচনে শেখ হাসিনার বিপক্ষে যারা প্রার্থী হয়েছিলেন তারা সবাই তাদের জামানাত হারিয়েছেন।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর এই আসনের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অনেকই দেশ ছেড়েছে কিংবা লুকিয়ে ছিল। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর কয়েকদিন কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া উপজেলার আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এলাকায় থেকে তাদের দলীয় প্রধানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন শুরু করে। তারা হাসিনার সঙ্গে প্রায়ই টেলিফোনে নানা কথাবার্তা বলত।
এর কিছুদিন পরে যৌথবাহিনী অভিযান শুরু করলে মামলা-হামলার ভয়ে এসব নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে যায়। বর্তমানে এ দুটি উপজেলার অধিকাংশ নেতাকর্মীরা জেলে এবং আত্মগোপনে রয়েছে।
অপরদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনি মাঠ গোছাতে তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে বিএনপি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সম্মেলন শেষ করে উপজেলা ও পৌর সম্মেলন করেছে। সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয়েছে । কমিটির নেতারা বিএনপির পক্ষে আগামী নির্বাচনি মাঠ তৈরির জন্য পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার চষে বেড়াচ্ছেন।
অপরদিকে বসে নেই জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। বিভিন্ন সময়ে সভা-সমাবেশ করে তারা তাদের শক্তি-সমর্থন জানান দিচ্ছে। এরই মধ্যে এই নির্বাচনি আসনে জামায়াতে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রফেসর রেজাউল করিমের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণার পর থেকেই তিনি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এসএম জিলানী। তিনি কোটাপলীপাড়া– টুঙ্গিপাড়ায় নির্বাচনি এলাকায় ব্যাপক সময় ব্যয় করছেন। প্রায়ই বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে মতবিনিময় সভা করছেন। গ্রাম, পাড়া-মহল্লায় ইউনিয়নে কর্মী সভা ও মতবিনিময় সাভায় যোগ দিচ্ছেন। এ ছাড়াও এলাকার সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজেকে জানান দিচ্ছেন এসএম জিলানী।
এই আসন থেকে তিনি এর আগে ২০০৮ এবং ২০১৮ সালে শেখ হাসিনার বিপক্ষে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন। তবে ওই দুটি নির্বাচনে তিনি জামানাত নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেননি। তবে এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। এস এম জিলানীর প্রতিটি সভা-সমাবেশে ব্যাপক জনসমাগম লক্ষ করা যাচ্ছে।
কোটালীপাড়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওলিউর রহমান হাওলাদার বলেন, আমরা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে আমাদের সব সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডই সম্পন্ন করেছি। এখন শুধু জনগণের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার পালা। সেক্ষেত্রেও আমরা বসে নেই। প্রতিদিনই কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়ার কোনো না কোনো এলাকায় সভা-সমাবেশ করছি এবং ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। বিএনপি প্রার্থী এসএম জিলানী দীর্ঘদিন ধরে কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়ায় মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন। বিপদেআপদে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
জামায়াতের কোটালীপাড়া উপজেলা আমির গাজী সোলায়মান বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে গোপালগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক রেজাউল করিমের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি একজন পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি। ইতোমধ্যে কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলার সব পাড়া-মহল্লায় আমরা আমাদের দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। জনগণের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এই আসনে আমাদের প্রার্থী জয়লাভ করবে।
নাম না প্রকাশ না করার শর্তে কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা বলেন, কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়ার জনগণ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাদের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। বর্তমান সময়ে দলীয় কর্মকাণ্ড না থাকলেও এই দুই উপজেলায় শেখ হাসিনার প্রতিই আস্থা রয়েছে। তিনি যদি কোনো কারণে এই আসন থেকে প্রার্থী না হতে পারেন সেক্ষেত্রে তার নির্দেশে স্বতন্ত্রভাবে কেউ প্রার্থী হলে তিনিই জয়লাভ করবেন।
জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক রেজাউল করিম নেতাকর্মীদের নিয়ে দুই উপজেলায় দলীয় প্রচারাভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের বিপদেআপদে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, জনগণ আমাদেরকে গ্রহণ করেছে। জনগণের কাছ থেকে যে রকম সাড়া পাচ্ছি তাতে আমরা ধারণা করছি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এই আসনে চমক দেখাবে বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক রেজাউল করিম।
বিএনপির প্রার্থী জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী বলেন, গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসন আওয়ামী লীগের দুর্গ বলে আমি বিশ্বাস করি না। বিগত দিনে এই আসনে সঠিক নির্বাচন হয়নি। এখানে প্রতিটি নির্বাচনে দুপুর ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে সব ভোট কেটে বাক্স ভরে তারপর গণনা করে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভালোবাসা দিয়ে কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া এলাকার মানুষদের মন জয় করতে পেরেছি। এসব মানুষ আগামী নির্বাচনে উন্নয়নের স্বার্থে ধানের শীষকেই বেছে নেবে। সেক্ষেত্রে আমি জয়ের জন্য শতভাগ আশাবাদী।
শুধু বিএনপি ও জামায়াতই নয়। এ আসনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল স্বল্প পরিসরে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। তবে কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়ায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
গণঅধিকার পরিষদের কোটালীপাড়া উপজেলার আহ্বায়ক আবুল বাশার দাড়িয়া বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে গণঅধিকারে কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে গণসংযোগ শুরু করেছি। খুব শিগগির আমরা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি গঠন করব। দল থেকে যাকে মনোনয়ন দিবে আমরা তার পক্ষে কাজ করব।