চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে যখন বিভিন্ন সরকারি সংস্থা খাল-নালা পরিষ্কারের জন্য ১০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দাবি করছিল, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা নিয়ে সামনে এলেন জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম মহানগর আমীর শাহজাহান চৌধুরী। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের এক বৈঠকে সরাসরি বলেন, ‘আমাকে অন্তত একটি খালের দায়িত্ব দিন। আমি কোনো টাকায় নয়, স্বেচ্ছাশ্রমে পরিষ্কার করে দেব।’
এই বক্তব্যের কয়েক দিনের মাথায় তিনি নিজের কথা বাস্তবে রূপ দিলেন। শনিবার সকালে নগরীর বাকলিয়া থানার ইছহাকের পুল সংলগ্ন অছিমিয়া দোস্ত ভবনের মাঠ থেকে শুরু হয় বির্জাখাল খনন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। এতে অংশ নেন প্রায় ২০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক। নিজেদের অর্থায়নেই এই কর্মসূচি চালাচ্ছে দলটি, যাতে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় এক কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে সময় লাগবে ২০ থেকে ২৫ দিন।
সকালে আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ‘গত ১৬ বছরে উন্নয়নের নামে চট্টগ্রাম শহরকে জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত করা হয়েছে। এমন স্বতঃস্ফূর্ত এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে নগরবাসী দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে পারে।’
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহানগর জামায়াতের আমীর শাহজাহান চৌধুরী এবং সঞ্চালনায় ছিলেন দলটির সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম, প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার আই ইউ এ চৌধুরী, নগর নায়েবে আমীর ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ এবং ইঞ্জিনিয়ার মানজারে খোরশেদ।
খাল খনন কার্যক্রম শুরুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শাহজাহান চৌধুরী জানান, কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফয়জুল কবির খান ও ফারুক ই আজমের সঙ্গে একটি বৈঠকে সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা জলাবদ্ধতা নিরসনে বিপুল অর্থ বরাদ্দ চায়। তখন তিনি প্রস্তাব দেন, একটি খাল দায়িত্ব দেওয়া হলে কোনো অর্থ ছাড়াই জামায়াত তা পরিষ্কার করে দেবে। তার এই প্রস্তাবে উপদেষ্টারা খুশি হয়ে বলেন, “আপনারাই পারবেন।’
জামায়াত নেতার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। নেটিজেনরা বলছেন, ‘জামায়াত যেভাবে কাজ করছে, তা রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে মানবিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য দলও যদি এমন উদ্যোগ নিতো, দেশ বদলে যেতো।’
প্রেরণার উৎস হিসেবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসিপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের উদাহরণ টানেন শাহজাহান চৌধুরী। বলেন, ‘আনোয়ার ইব্রাহিম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ২০ বছর জেল খেটেছেন, কিন্তু তিনি রাজনীতিকে কখনো নেতিবাচকভাবে দেখেননি। তার জীবনী পড়ে আমি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরদোয়ান এক সময় রাস্তায় ৫০০ কর্মী নিয়ে ঝাড়ু হাতে সড়ক পরিষ্কার করতেন। আমি তাদের পথ অনুসরণ করছি।’ জলাবদ্ধতা থেকে চট্টগ্রামকে মুক্ত করতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে এমন বাস্তবমুখী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন নাগরিকরা।