খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) এলাকায় বড় বড় বিলবোর্ডগুলো এক সময় সারা বছর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের ব্যানারে দখল হয়ে থাকত। এর বাইরে যত্রতত্র প্যানা ফেস্টুন টানিয়ে নগরীর সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি নোংরা হতো পরিবেশ।
রাজনৈতিক পালাবদলে পুরোনোরা না থাকলেও সেখানে দখলদারিত্ব কায়েম হয়েছে নতুনদের। স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন বিএনপি নেতারা; পাশাপাশি রয়েছে নবগঠিত এনসিপি। এদিকে প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় বিজ্ঞাপনদাতারা চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করছেন না। ফলে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে কেসিসি।
কেসিসির লাইসেন্স শাখা সূত্রে জানা গেছে, মহানগরী এলাকায় ৬৮টি বিলবোর্ড রয়েছে আর সাইনবোর্ড রয়েছে ২৮৭টি। বিলবোর্ডগুলো বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছে ভাড়া দেওয়া। তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের সঙ্গে চুক্তি করে বছরব্যাপী পণ্যের প্রচার চালাতে বিলবোর্ডের রক্ষণাবেক্ষণ করে।
এছাড়া ‘সিটি বিউটিফিকেশন’ প্রকল্পের আওতায় ছয়টি সংস্থাকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রোড ডিভাইডার ও রোড আইল্যান্ডের সৌন্দর্য বর্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা এসব এলাকায় শোভাবর্ধক গাছ, ফুলের চারা লাগানো ও পরিচর্যা করেন। সে সঙ্গে রোড ডিভাইডারে স্থাপিত বোর্ড ভাড়া দিয়ে আয় করেন। তবে বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ডগুলো মাসের পর মাস রাজনৈতিক নেতাদের প্যানা ফেস্টুনে আটকে থাকায় তাদের আয়ে ধস নেমেছে।
কেসিসির লাইসেন্স অফিসার শেখ মো. দেলওয়ার হোসেন জানান, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকার বিজ্ঞাপনের বর্ধিত রেট নির্ধারণ করলে ক্ষেত্রবিশেষে তা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
সে সময় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো হাইকোর্টে রিট করে। রিটে হেরে গেলে আপিল বিভাগে গিয়ে তারা স্টে অর্ডার করায়। তবে এ মামলার অজুহাত তুলে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান তখন থেকে বিল পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। অন্যরা পুরোনো রেটে কিছু কিছু বিল দিতে থাকে।
জানা গেছে, সরকার প্রবর্তিত নতুন রেটের হিসাবে কেসিসি এলাকায় নিয়োজিত বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর কাছে পাওনা বকেয়া রয়েছে ২১ কোটি ১৪ লাখ এক হাজার ৬০১ টাকা। পুরোনো রেটে এর পরিমাণ প্রায় ছয় কোটি টাকা। সে টাকা আদায়েও রয়েছে ব্যর্থতা।
অভিযোগ আছে, রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিরা সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগসাজশ করে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা হাতিয়ে নিয়ে তাদের নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। বিশেষ করে আওয়ামী সরকারের আমলে তালুকদার আব্দুল খালেক মেয়র থাকাকালে এই অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা অহরহ ঘটেছে।
তবে পটপরিবর্তনের পর কেসিসির বিভিন্ন শাখার দায়িত্বে পরিবর্তন আসায় অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দূর করে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কেসিসির চিফ লাইসেন্স অফিসার মনিরুজ্জামান রহিম আমার দেশকে জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিলবোর্ড থেকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৫০ লাখ টাকা। আদায় হয়েছে এক কোটি ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩০ টাকা। এতে ৪৫ লাখ টাকারও বেশি ঘাটতি রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে আয় ছিল ৭৮ লাখ ৯৮ হাজার ১০৭ টাকা।
সারা বছর রাজনৈতিক দলের প্যানা, ব্যানার, ফেস্টুনে বিলবোর্ড-সাইনবোর্ডগুলো দখল হয়ে থাকে জানিয়ে কেসিসির এই কর্মকর্তা বলেন, সবাই এ শহরের মানুষ। সবাই চেনা-পরিচিত, সমাজে স্বনামধন্য। আমরা তাদের অনুরোধ করতে পারি।
জানা গেছে, সিটি বিউটিফিকেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি লাপাত্তা হয়ে গেছে। যার কাছে কেসিসির পাওনা রয়েছে প্রায় ১৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে বিলবোর্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১৫ কোম্পানি উধাও হয়ে গেছে। তাদের কাছে কেসিসির পাওনা দুই কোটি ৩৭ লাখ ২৯ হাজার ২৫ টাকা। তাদের ঠিকানায় কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হলেও তা ফেরত এসেছে।
এ প্রসঙ্গে বৃষ্টি অ্যাডভারটাইজিংয়ের সিরাজুল ইসলাম বলেন, বোর্ড ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করা আমাদের জন্য দুরূহ হয়ে যাচ্ছে। দুই ঈদ, বিশেষ দিবস আর দলীয় কর্মসূচির কারণে রাজনৈতিক নেতারা মাসের পর মাস বোর্ড আটকে রাখেন।
বছরে সাকূল্যে দুই মাস হয়তো আমরা বোর্ড খালি পাই। কাকে বলব—কথা বলারই সাহস পাই না। বোর্ড বসিয়েছি, একদিনের জন্যও ভাড়া হয়নি। অথচ কেসিসিকে ট্যাক্স দিতে হয়।
বন্ধু মিডিয়ার মাহবুবুর রহমান বলেন, নানা সংকটের মধ্য দিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। ৩০ জুলাই বিলবোর্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন রয়েছে। ভোট শেষ হলে আমরা এসব সমস্যা সমাধানে মাঠে নামব।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সংগঠক আহম্মদ হামীম রাহাত বিলবোর্ডে দলীয় প্যানা স্থাপনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমরা অনুমতি নিয়ে দুই থেকে তিনদিনের জন্য প্যানা লাগাই। কর্মসূচি শেষ হওয়া মাত্র নিজস্ব উদ্যোগে খুলে নিই।
কিন্তু দেখা গেছে, অতীতের মতো এখনো অনেকেই দিনের পর দিন বিলবোর্ডগুলো দখল করে রাখছেন। তারা অপরাজনীতির চর্চা করছেন।