নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে ভার্চুয়াল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন দলটির পলাতক নেতারা। দলীয় শক্তি বাড়াতে ভেতরে ভেতরে চালানো হচ্ছে নানামুখী কাজ। এসব কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আয়েন উদ্দিন।
সম্প্রতি রাজশাহীতে নিষিদ্ধ সংগঠনটির কয়েকটি ভার্চুয়াল সভা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। দেশ-বিদেশে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্ক টিম তৈরি করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সূত্রটি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের জনসাধারণ কোনোক্রমেই আওয়ামী লীগকে গ্রহণ বা ফিরতে দেবে না।
রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠ নওহাটা, কাটাখালী, হড়গ্রাম ও হরিয়ান এলাকার আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জানান, নিয়মিত তাদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করছেন এবং আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। তারা বলেন, নগরীসহ পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় ঊর্ধ্বতন নেতাদের, যারা দেশে-বিদেশে আত্মগোপনে আছেন, তাদের সঙ্গে নিয়মিত অনলাইন মিটিং হচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া নির্দেশনা অনুযায়ী, বিভিন্ন কৌশলে ইতোমধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা এলাকায় অবস্থান করছেন এবং ধীরে ধীরে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন।
জানা গেছে, জেলার প্রতিটি ইউনিয়নের পাঁচজন ও পৌরসভাগুলো থেকে ১১ জন করে শিক্ষক নিয়ে জেলা পর্যায়ে গত ৪ মে ভার্চুয়াল সভা হয়। সভায় একটি অনলাইন ভার্চুয়াল টিম গঠন করা হয়েছে। তারা জেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করবেন।
সূত্রটি জানায়, বিদেশে অবস্থানরত সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন গত ১৫ মে একটি ভার্চুয়াল মিটিং করেছেন। মিটিংয়ে তিনি দল নিষিদ্ধের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে মনোবল শক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। ভার্চুয়াল মিটিংগুলোতে তারা আশা প্রকাশ করে বলেন, শিগগির ইউনূস সরকার ব্যর্থ হবেন।
আত্মগোপনে থাকা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুরে স্থানীয় নেতা সাইদুর রহমান বলেন, ‘বাঘা-চারঘাটের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম আমাদের সঙ্গে কয়েকটি ভার্চুয়াল মিটিং সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মিটিংয়ে শাহরিয়ার আলম বলেছেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। তিনি নানান কৌশল অবলম্বন করে হলেও স্থানীয় কর্মি-সমর্থকদের নিজ নিজ এলাকায় পুনর্বাসনের ব্যাপারে বারবার গুরুত্ব দিচ্ছেন।’ তবে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েক জন নেতা জানান, শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে এ পর্যন্ত যোগাযোগ হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলার নওহাটা পৌরসভার (আওয়ামী লীগের সময়ে নিয়োগ পাওয়া) এক কলেজশিক্ষক বলেন, ‘সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আয়েন উদ্দিন অনলাইনের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত তাদের অবগত করছেন। বিশেষ করে স্থানীয় কর্মীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। এছাড়া তার সময়ে নিয়োগ দেওয়া স্থানীয়পর্যায়ের স্কুল, কলেজ, মাদরাসার প্রধানদের কাজ লাগানোর জন্য তাদের নিয়ে ইতোমধ্যে একটি ভার্চুয়াল সভা হয়েছে বলে অপর একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এসব বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এম রফিকুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ অন্যায়, অপরাধ ও অত্যাচারের প্রতীক। এ দেশের মানুষের অন্তরে তাদের দেওয়া ক্ষত এখনো তাজা হয়ে রয়েছে। দল-মতের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের ব্যাপারে কেউ আপস করবে না, বরং এক হয়ে আবার লড়াই করবে।
ড. এম রফিকুল ইসলাম বলেন, পুনর্বাসনের ব্যাপারে তারা চেষ্টা চালাচ্ছে, চালাবে কিন্তু সফল হবে বলে মনে করছি না। এছাড়া তারা যদি ভাবে আমলা বা প্রশাসনের মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা লোকদের দিয়ে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে সেটাও কঠিন। কারণ এখন সবাই সচেতন হচ্ছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনতে সরকার চেষ্টা করছে। এখনো সব দল অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ভরসা রাখছে, তাদের সঙ্গে কাজ করছে। আমি বিশ্বাস করি দেশের জনসাধারণ কোনোক্রমেই আওয়ামী লীগকে ফিরতে দেবে না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজশাহীর সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমরা শুনেছি খায়রুজ্জামান লিটন ও শাহরিয়ার আলমসহ কিছু সাবেক এমপি ভার্চুয়ালি নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলকে পুনর্গঠিত করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা ১৭ বছরের অন্যায়, অত্যাচার আর গণহত্যার কথা ভুলে যাইনি। আমরা ফুরিয়ে যাইনি।’ সালাহউদ্দিন আম্মার আরো বলেন, ‘স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই— আমরা বেঁচে থাকলে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই। দেশের শিক্ষার্থী ও জনসাধারণকে নিয়ে প্রয়োজনে আবার মাঠে নামব, তবু অত্যাচারী, রক্তখেকো এ দলকে ফিরে আসতে দেব না।’
এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজশাহীর সাবেক সমন্বয়ক তাসিন খান বলেন, আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ৫ আগস্ট বাংলার মানুষ রায় দিয়ে দিয়েছে। এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য। আমরা চাই তারা সামনে আসুক, সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হোক। তখনই বোঝা যাবে তাদের জন্য দেশবাসী কী নিয়ে অপেক্ষা করছে।
তাসিন খান আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যদি ভাবে ভার্চুয়াল মিটিং করে, নিজেদের সংগঠিত করে পুনরায় ফিরে আসবে— তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। আমরা তাদের নিয়ে একদমই ভীত নই, বরং মোকাবিলা করতে প্রস্তুত আছি।’