হোম > বাণিজ্য

* দ্রব্যমূল্য বাড়ায় কমেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

* বিক্রি কমেছে ৬০-৭০ শতাংশ

* বাধ্য হয়ে কর্মী ছাঁটাই করতে হচ্ছে

ক্রেতাশূন্য মার্কেটে দোকানিদের হাহাকার

সোহেল রহমান

ছবি: সংগৃহীত

সকাল গড়িয়ে দুপুর, তবু দোকানের সামনে নেই কোনো ক্রেতা। বিক্রির আশায় শাটার খুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও কাস্টমারের দেখা মিলছে না। অথচ দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীর বেতন—সব খরচ ঠিকমতো পরিশোধ করতে হচ্ছে। আগে যেখানে সকাল থেকেই ক্রেতার আনাগোনা থাকত, এখন দুপুর পর্যন্ত একজন কাস্টমারেরও দেখা মেলে না। বিক্রি না থাকায় অর্ধেক সেলসম্যান ছাঁটাই করে দোকান চালাচ্ছি। জানি না এভাবে আর কত দিন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারব—হতাশ কণ্ঠে বলছিলেন রাজধানীর একটি বিপণিবিতানের এক ব্যবসায়ী।

আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্যসহ সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় কমেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। জরুরি নিত্যপণ্য ছাড়া কেনাকাটা এড়িয়ে চলছেন ক্রেতারা। এ কারণেই ভোগ্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে বড় বড় মার্কেট বা শপিংমলে এখন ক্রেতার হাহাকার। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপর। বিক্রি কমে যাওয়ায় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন দোকানিরা। অনেকে কর্মী ছাঁটাই করে খরচ কমিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমল ও বিপণিবিতান ঘুরে ক্রেতা সংকটে দোকানদারদের এমন করুণ চিত্র দেখা গেছে।

ঢাকার নিউ মার্কেট, গাউছিয়াসহ আশপাশের বেশিরভাগ মার্কেটে দেখা যায়, ক্রেতার উপস্থিতি খুবই কম। দোকানিরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলছে না। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেচাকেনা নেমে এসেছে প্রায় দশ ভাগের এক ভাগে। কেউ কেউ লোকসান সামলে কোনোভাবে ব্যবসা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, অনেকে আবার ধারাবাহিক ক্ষতিতে পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ীদের অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন।

রাজধানীর নূর ম্যানশন মার্কেটের শাড়ি কাপড়ের শোরুম বি প্লাস লিমিটেডের পরিচালক মো. মোবারক আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে আমাদের মতো যারা আছেন, সবাই অত্যন্ত সংকটের মধ্যে আছেন। দীর্ঘদিনের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার মতো অবস্থায় চলে এসেছি। আগে যেখানে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মতো বেচাকেনা হতো, সেটা এখন ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। দোকানের বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

তিনি বলেন, আমার শোরুমে ২০ জন সেলসম্যান ছিল। ব্যয় কমাতে ১০ জনকে ছাঁটাই করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। তারপরও দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীর বেতন ঠিকমতো দিতে পারছি না। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে, দোকান চালানোর খরচও বেড়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। এজন্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সন্ধ্যার মধ্যে শোরুম বন্ধ করে ফেলি। সব মিলিয়ে আমরা খুব খারাপ অবস্থায় আছি। জানি না কতদিন এভাবে চালিয়ে যেতে পারব।

নিত্যপণ্যের বাজারে ক্রেতার যখন টানাপোড়েন, তখন শৌখিন বা গিফট আইটেমের ব্যবসার হাল কেমন চলছে—হতাশ কণ্ঠে তার বর্ণনা দিলেন হোম ডেকোর ও শৌখিন পণ্যের পুরাতন ব্যবসায়ী চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের আফরা কালেকশনের স্বত্বাধিকারী মো. শরিফ। তিনি বলেন, আমাদের পণ্যগুলো মূলত ঘর সাজানো কিংবা উপহার দেওয়ার জন্য মানুষ কিনে থাকে। জীবনধারণের প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য কেনার পর মানুষ সাধারণত এসব শৌখিন পণ্যের দিকে আসে। কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পর শৌখিন সামগ্রীর জন্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, আগে যেসব ক্রেতা নিয়মিত ঘর সাজানোর সামগ্রী কিংবা উপহারসামগ্রী কিনতেন, তাদের অনেকেই এখন কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ দোকানে এসে পণ্য দেখছেন, দাম জানতে চাইছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন। শৌখিন পণ্যের বাজারে বিক্রি অনেকটাই নির্ভর করে মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকার ওপর। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারের মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ সেদিকেই চলে যাচ্ছে। ফলে ঘর সাজানো, উপহার কিংবা শখের সামগ্রী কেনার মতো খাতে ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে অনেক পরিবার। এতে ক্রেতার উপস্থিতি ও বিক্রি আগের তুলনায় কমেছে।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, শুধু উৎসব বা বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে নয়; স্বাভাবিক সময়েও এসব পণ্যের ভালো চাহিদা ছিল। এখন সে চিত্র বদলে গেছে। ক্রেতারা প্রয়োজনের বাইরে খরচের ক্ষেত্রে অনেক বেশি হিসাবি হওয়ায় শৌখিন পণ্যের বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পাওয়া এবং ব্যবসার দৈনন্দিন খরচ মেটানোও সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ আমার দেশকে বলেন, আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি । বহুমুখী সমস্যা চারদিক থেকে চেপে ধরেছে। একে তো ব্যবসার চরম মন্দা অবস্থা, তার ওপর একটি শ্রেণি দখলদারিত্ব ও সার্ভিস চার্জের নামে চাঁদাবাজি করছে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে সার্বিক পরিস্থিতি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

তিনি বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি এখন একেবারেই স্বাভাবিক নয়। বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারছেন না। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের হাতে খরচযোগ্য অর্থ কমে যাওয়ায় কেনাকাটায় চরম ভাটা পড়েছে। শুধু ক্রেতা সংকটই নয়, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী জমি, ফ্ল্যাট বিক্রি করে বা মূলধন ভেঙে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

নাজমুল হাসান আরো বলেন, ব্যবসায়ীদের অন্যতম দাবি সহজ শর্তে স্বল্পসুদের ঋণ। কারণ, ঋণের সুদ বেশি হলে মুনাফার বড় অংশই চলে যায় ঋণের খরচ মেটাতে। ২০২৬ সালে সিএমএসএমই খাতে কার্যকরী মূলধন বাড়াতে ‘সিএমএসএমই ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল রিফাইন্যান্স ফান্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ওই অর্থ আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছায় না। এসএমই লোন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ। জিডিপিতে আমাদের অবদান প্রায় ১৬ শতাংশ হলেও ঋণের জন্য মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এছাড়া জামানত, কাগজপত্র, ঋণ অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যাংকের কঠোর শর্তের কারণে অনেক ছোট ব্যবসায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ৭০ লাখ দোকান ব্যবসায়ীর পরিবারসহ প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলেও সরকারিভাবে আমাদের জন্য কিছুই করা হচ্ছে না। এর মধ্যে মার্কেট এলাকায় চাঁদাবাজি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের খুচরা বাণিজ্য ও বিপণিবিতানের ব্যবসা শুধু কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতির বড় একটি অংশ সরাসরি যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সংকুচিত হওয়া মানে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তার প্রভাব পড়বে। ক্রেতা কমে গেলে বিক্রি কমে, আয় কমে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ তৈরি হয়।

তারা বলেন, দেশের মার্কেট ও শপিংমলগুলোয় লাখ লাখ মানুষ কাজ করেন। ব্যবসা মন্দার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে গেলে নতুন বেকারত্ব তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শুধু পরিবারের আয়-ব্যয়ের ওপর নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়বে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে খুচরা বাজারে ক্রেতা সংকট অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সামাজিক সংকট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবজিতে স্বস্তি মিললেও মাছ-মুরগি-ডিমে অস্বস্তি

জেনেভায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ উদ্যোগের প্রশংসা

চামড়া শিল্পে বড় সংস্কার পরিকল্পনা সরকারের

হাইটেক পার্কের প্রতিষ্ঠানের বিদেশি অর্থ পরিশোধে ছাড়

জামানত ছাড়া তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা ঋণ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

আইডিআরএর উদ্যোগে ১৪.৫১ কোটি টাকার দাবি পরিশোধ

স্বর্ণের দাম ভরিতে বাড়ল ৫৪৮২ টাকা

দুই মাসে পোশাক রপ্তানিতে আয় ৭৫০ কোটি ডলার

জ্বালানি সংকটে বর্তমান সরকারের কোনো দায় নেই: তিতুমীর

তিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডির নিয়োগ বাতিল