কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মানুষের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও সামনে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে এআইয়ের কারণে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি পদ ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেশটির কর্মী ছাঁটাইবিষয়ক প্রতিষ্ঠান চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাসের ১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োগকর্তারা মোট পাঁচ লাখ ৭৩ হাজার ১৯৫টি পদ ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার ১৩৬টি পদ ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে এআইকে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোট ঘোষিত ছাঁটাইয়ের প্রায় ২১ শতাংশ।
এছাড়া শুধু সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ছাঁটাই করা মোট ৪৩ হাজার ২৮১টি পদের মধ্যে ৩,৯৬১টির জন্য এআইকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব সংখ্যা ঘোষিত ছাঁটাইয়ের হিসাব; সবক্ষেত্রে কর্মীরা ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেনÑএমন নয়।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ের কারণে ৫৪ হাজার ৮৩৬ জনকে ছাঁটাই করা হয়। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই ওই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
বদলে যাচ্ছে চাকরির ধরন
এআইয়ের প্রভাব শুধু ছাঁটাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বদলে যাচ্ছে কাজের ধরনও। তথ্য বিশ্লেষণ, নথি তৈরি, গ্রাহকসেবা, অনুবাদ ও সফটওয়্যার তৈরির মতো কাজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একই পরিমাণ কাজের জন্য কম কর্মী প্রয়োজন হতে পারে।
২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও পোল্যান্ডের ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি চারজন কর্মীর একজন এমন পেশায় নিয়োজিত, যেখানে জেনারেটিভ এআইয়ের প্রভাব পড়তে পারে। দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজে এ ঝুঁকি বেশি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরো চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে কাজের ধরন পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, অনেক পেশায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও মানুষের বিচার-বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ ও তদারকির প্রয়োজন থেকে যায়।
নতুন চাকরির পাশাপাশি বাড়বে দক্ষতার চাহিদা
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘ফিউচার অব জবস ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑপ্রযুক্তি, অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও সবুজ অর্থনীতির পরিবর্তনের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে। একই সময়ে ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত বা স্থানচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নিট সাত কোটি ৮০ লাখ চাকরি বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে প্রযুক্তিসহ একাধিক বৈশ্বিক প্রবণতার সম্মিলিত প্রভাব বিবেচনা করা হয়েছে। ডব্লিউইএফের জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ শতাংশ নিয়োগকর্তা জানিয়েছেন, এআইয়ের মাধ্যমে কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ায় তারা কর্মীসংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করছেন। একই সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের নতুন দক্ষতা শেখানো এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই তাদের অন্য কাজে নিয়োজিত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
এআইয়ের ওপর কর চান বিল গেটস
এআইয়ের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান ও কর আদায় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তার মতে, মানুষের পরিবর্তে এআই বা রোবট দিয়ে কাজ করালে বেতনভিত্তিক কর কমে যেতে পারে। তাই এআই ও রোবটের ব্যবহার কীভাবে করের আওতায় আনা যায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষের কর্মসংস্থান সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
সম্প্রতি সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে বিল গেটস বলেন, আগের সব প্রযুক্তির তুলনায় এআই বিশ্বকে অনেক বেশি বদলে দিতে পারে। এআই মডেলগুলোর উন্নতির গতি এবং মানুষের শ্রমের পরিবর্তে এগুলো ব্যবহারের আর্থিক প্রণোদনা বিবেচনায় নিয়ে সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑএআই ও রোবটের ব্যবহার কীভাবে করের আওতায় আনা যায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষের কাজ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
বিল গেটসের যুক্তি, প্রচলিত করব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে কর্মীর পরিবর্তে প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মী নিয়োগ করলে তার বেতনের ওপর কর দিতে হয়। কিন্তু কর্মীর পরিবর্তে রোবট বা এআই ব্যবহার করলে সে ধরনের বেতনভিত্তিক কর আর দিতে হয় না। ফলে প্রযুক্তি দিয়ে শ্রমের বিকল্প তৈরি করা কোম্পানির জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠতে পারে।
তার এ প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার অর্থায়নের প্রশ্নও জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মীর বেতন থেকে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ৬.২ শতাংশ এবং মেডিকেয়ারের জন্য ১.৪৫ শতাংশ কর নেওয়া হয়। নিয়োগকর্তাও সাধারণত সমপরিমাণ কর দেন। মানুষের পরিবর্তে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে এ ধরনের করের ভিত্তি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল আগে থেকেই আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের ২০২৬ সালের ট্রাস্টি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবসরকালীন সুবিধা ও উত্তরাধিকারীদের সুবিধা প্রদানকারী মূল তহবিলের সঞ্চিত অর্থ ২০৩২ সালে শেষ হয়ে যেতে পারে। এরপর চলমান আয় দিয়ে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সুবিধার প্রায় ৭৮ শতাংশ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সম্প্রতি এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে বিল গেটস বলেন, এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের আরো সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। এ নিয়ে আমি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। কারণ, এআই নিঃসন্দেহে এতটা শক্তিশালী যে, এটি এমন সব ঘটনা ঘটাতে পারে, যার ফলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।