বিমা কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্য সবসময় প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না বলে অভিযোগ করেছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। অনেক কোম্পানি তথ্য গোপন করতে একাধিক বা ‘ডাবল সার্ভার’ ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ তার। এসব গোপন বা অতিরিক্ত সার্ভার সরিয়ে তথ্যব্যবস্থাকে একীভূত করতে কোম্পানিগুলোকে ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, কারও গ্যারেজে, বিছানার নিচে কিংবা অন্য কোথাও সার্ভার লুকিয়ে রাখা হলেও তা খুঁজে বের করা হবে।
তিনি বলেন, ‘এটা তাদের জন্য আমার সতর্কবার্তা। ছয় সপ্তাহের মধ্যে গোপন বা অতিরিক্ত সার্ভার সরিয়ে সব তথ্য একীভূত করতে হবে। যারা করবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) কুমিল্লার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (বার্ড) ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী আবাসিক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মীর নাদিয়া নিভিন।
‘কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে সহজে নিউজ লেখার কৌশল’ এবং আর্থিক প্রতিবেদন ও তথ্য বিশ্লেষণবিষয়ক এ কর্মশালায় আইআরএফের সভাপতি গোলাম মওলার সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা কাজীম উদ্দিন এবং কোম্পানিটির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা প্রবীর চন্দ্র দাস।
বিমা খাতের তথ্যের স্বচ্ছতা, ডিজিটাল রূপান্তর, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, গ্রাহকের বকেয়া দাবি পরিশোধ এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিয়ে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত কথা বলেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
প্রকৃত তথ্য না পেলে তদারকি সম্ভব নয়
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, লাইফ ও নন-লাইফ—দুই খাতের অনেক কোম্পানির তথ্যব্যবস্থায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। আইডিআরএকে কোম্পানিগুলো যে তথ্য দেয়, তা সবসময় প্রকৃত তথ্য নয়। একাধিক সার্ভার থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা, প্রিমিয়াম আয় ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্রও থাকে না।
তিনি বলেন, শুধু আর্থিক প্রতিবেদন দেখে একটি কোম্পানির প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। কোম্পানিগুলোকে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে আইডিআরএর আইনি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য শুধু প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। এসব তথ্য বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে। গণমাধ্যম জনগণের কাছ থেকে পাওয়া বাস্তব তথ্য ও সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে তুলে ধরলে সংস্কার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, ২০২৬ সালে বসে যদি ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন পাওয়া যায়, তাহলে সেই তথ্য দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি কার্যকরভাবে তদারকি করা কঠিন। তার ওপর কোম্পানিগুলো যে তথ্য দিচ্ছে, সেটিই যদি সঠিক না হয়, তাহলে দেড় বছর আগের তথ্য দেখে বর্তমান ঝুঁকি শনাক্ত করা নিয়ন্ত্রকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
ডিসেম্বরে চালু হবে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি
বিমা খাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথাও জানান মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুরোপুরি ‘রিস্ক বেজড সুপারভিশন’ বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে।
এর মাধ্যমে কোনো কোম্পানি কী ধরনের তথ্য দিচ্ছে, কোথায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে—তা আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রথম হিসেবে আইডিআরএ এ ধরনের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে।
গ্যারেজে বা বিছানার নিচে সার্ভার লুকালেও খুঁজে বের করা হবে
দ্বৈত সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
যেসব কোম্পানির একাধিক বা গোপন সার্ভার রয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করে একীভূত করতে ছয় সপ্তাহের সময় দেওয়া হয়েছে।
নিজের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোথায় সার্ভার লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তা শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা করা আইডিআরএর জন্য কঠিন নয়।
তার ভাষায়, ‘গ্যারেজে, বিছানার নিচে বা দেশের যেকোনো জায়গায় সার্ভার লুকিয়ে রাখলেও প্রয়োজনে তা শনাক্ত করা হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও বিএসইসির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ
বিমা কোম্পানিগুলোর তথ্য গোপনের সুযোগ বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনার কথাও জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক হিসাব শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এনবিআরের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিএসইসির সঙ্গে যৌথ বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, কোনো কোম্পানির তথ্য যাচাই করতে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আলাদাভাবে চিঠি দেওয়া এবং জবাবের জন্য অপেক্ষা করার বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তন করা দরকার।
তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া গেলে কোনো চেয়ারম্যান বা কর্মকর্তার পরিবর্তন হলেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
চার মাসের মধ্যে ইউনিক পলিসি আইডি
বিমা খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে পুরো খাতের জন্য একটি অভিন্ন ‘ইউনিক পলিসি আইডি’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
বর্তমানে প্রতিটি বিমা কোম্পানির নিজস্ব পলিসি নম্বর থাকলেও পুরো বিমা খাতের জন্য কোনো অভিন্ন পরিচয় নম্বর নেই। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি পলিসির জন্য আলাদা ও কেন্দ্রীয়ভাবে শনাক্তযোগ্য একটি নম্বর থাকবে।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, ব্যাংক হিসাব নম্বরের মতো পুরো বিমা খাতের জন্য একটি ইউনিক পলিসি আইডি চালু করা হচ্ছে। আইডিআরএর দল ইতোমধ্যে বিভিন্ন কোম্পানিতে গিয়ে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা স্থাপন, প্রশিক্ষণ এবং ইউনিক পলিসি আইডি চালুর কাজ করছে।
আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পুরো খাতে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তার মতে, এ ব্যবস্থা চালু হলে ভুয়া প্রিমিয়াম দেখানো, ব্যবসার তথ্য আংশিকভাবে প্রকাশ করা কিংবা একই ব্যবসা নিয়ে তথ্য গোপনের সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।
এলসি খোলার আগে কভার নোট যাচাই
নন-লাইফ বিমা খাতের ব্যবসায় স্বচ্ছতা আনতে এলসির বিপরীতে ডিজিটাল যাচাইব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আইডিআরএ থেকে দেওয়া ইউনিক কভার নোট আইডি ছাড়া কোনো ব্যাংক এলসি খুলতে পারবে না। এলসি খোলার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থার মাধ্যমে আইডিআরএর সিস্টেম থেকে সংশ্লিষ্ট কভার নোট যাচাই করা হবে।
এর ফলে প্রতিটি এলসির বিপরীতে বিমা করা হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট বিমা ব্যবসার পরিমাণ কত—সে তথ্য আইডিআরএর কাছে থাকবে। এতে ব্যবসার প্রকৃত পরিমাণ গোপন করার সুযোগ কমে আসবে।
আগামী সপ্তাহ থেকে বকেয়া দাবি পরিশোধ
বকেয়া বিমা দাবি পরিশোধে সংকটে থাকা কয়েকটি কোম্পানির সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য সম্পদ নগদায়নের মাধ্যমে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে বলেও জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, প্রথম ধাপে সাত থেকে আটটি কোম্পানিকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এসব কোম্পানির জমি বিক্রি, ট্রেজারি বন্ড ও স্থায়ী আমানতসহ বিভিন্ন সম্পদ নগদায়ন করে পাওয়া অর্থ আইডিআরএর তদারকিতে পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়েছে। সেই অর্থ থেকেই গ্রাহকদের বকেয়া দাবি পরিশোধ শুরু হবে।
দাবি পরিশোধে ‘আগে আবেদন, আগে পরিশোধ’ নীতি অনুসরণ করা হবে বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ যে গ্রাহকের দাবি আগে এসেছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তার দাবিই আগে পরিশোধ করা হবে।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ব্যাংক হিসাবে আইডিআরএর তদারকি ও নিরীক্ষকদের উপস্থিতি থাকবে। কোম্পানিগুলো নিজেরা সরাসরি সেই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পাবে না।
তিনি জানান, কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাওয়া গ্রাহকদের দাবির তালিকাও নিরীক্ষকদের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।
ফারইস্ট দিয়ে শুরু, সম্পদ বিক্রি করে দাবি পরিশোধ
বকেয়া দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদাহরণ দিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দাবি পরিশোধ না করার বিষয় রয়েছে।
এ কারণে কোম্পানিটির নতুন প্রথমবর্ষের প্রিমিয়াম গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে নবায়ন প্রিমিয়াম নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ফারইস্টের ফেনীর একটি জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং কিছু বন্ড নগদায়নের অর্থ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিকভাবে কয়েকশ কোটি টাকা দিয়ে পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
এ ছাড়া আরও কয়েকটি সম্পত্তি বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সেগুলো বিক্রি হলে পর্যায়ক্রমে সেই অর্থও গ্রাহকদের দেওয়া হবে।
এক প্রশ্নের উত্তরে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, ফারইস্টের সব সম্পদ ও বন্ড নগদায়ন করা গেলে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে। এই অর্থ দিয়ে বড় একটি অংশের দাবি নিষ্পত্তির পর কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ ব্যবসা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঘুষ দিলে বা নিলে সরাসরি মামলা
আইডিআরএতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, কোনো বিমা কোম্পানি আইডিআরএর কোনো কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করলে সতর্ক করার পরিবর্তে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে আইডিআরএর কোনো কর্মকর্তা কোনো কোম্পানির কাছে ঘুষ চাইলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ধরনের কোনো ঘটনার প্রমাণ থাকলে সাংবাদিকদের তা সরাসরি তাকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
তার ভাষায়, দুর্নীতির ক্ষেত্রে বিমা কোম্পানি হোক বা আইডিআরএর কর্মকর্তা—কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
১৫০ কর্মী দিয়ে ৮২ কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ
আইডিআরএর জনবল সংকটের কথাও তুলে ধরেন মীর নাদিয়া নিভিন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে প্রায় ৭ হাজার কর্মী দিয়ে ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে মাত্র প্রায় ১৫০ জন জনবল দিয়ে আইডিআরএকে ৮২টি বিমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।
এ ছাড়া আইডিআরএর আইনগত দুর্বলতাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ২০১০ সালের বিমা আইন বর্তমান আর্থিক খাতের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সময়ের সঙ্গে আইন হালনাগাদ ও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
নির্দেশনা না মানলে ব্যবসা করা কঠিন হবে
বিমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারের মতো কাজ করতে চান জানিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কোম্পানিগুলোকে আইডিআরএর নির্দেশনা অবশ্যই মানতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো কোম্পানি নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা না মানলে তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে দেওয়া হবে।
‘সামনে আইডিআরএকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখতে পাবেন,’ বলেন তিনি।
তার মতে, আইডিআরএর মূল দায়িত্ব হলো পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা করা। বিমা খাতকে একটি শক্তিশালী আর্থিক খাতে পরিণত করতে হলে প্রথমে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
সময়মতো দাবি পরিশোধই আস্থা ফেরানোর প্রধান উপায়
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা কাজীম উদ্দিন বলেন, সময়মতো গ্রাহকের দাবি পরিশোধ না করাই বর্তমানে বিমা খাতে আস্থাহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ।
তিনি বলেন, কয়েকটি কোম্পানির আর্থিক অক্ষমতা ও দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার নেতিবাচক প্রভাব পুরো বিমা শিল্পের ওপর পড়ছে। মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিমার টাকা পেতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়।
এ অবস্থায় সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে আইডিআরএ চেয়ারম্যানের নেওয়া উদ্যোগকে স্বাগত জানান তিনি।
কাজীম উদ্দিন বলেন, ‘বিমা খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো দাবি পরিশোধ করা। আমরা যদি সবাই গ্রাহকের প্রাপ্য টাকা নির্ধারিত সময়ে দিতে পারি, তাহলে এই শিল্প অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’
নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি ১৯৮৭ সাল থেকে ন্যাশনাল লাইফে কাজ করছেন। ২০২০ সালে কোম্পানিটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মৃত্যুর পর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গ্রাহকের দাবি দ্রুত পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালে ন্যাশনাল লাইফ মোট ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার বিমা দাবি পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ১১০ কোটি টাকা ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ, সারভাইভাল বেনিফিট ও অন্যান্য নির্ধারিত সুবিধার অর্থ।
তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকের পাওনা দেওয়ার নির্ধারিত দিনেই অর্থ তার ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়েছে। কোথাও কোথাও কোম্পানির কর্মীরা সরাসরি গ্রাহকের বাড়িতে গিয়ে চেক পৌঁছে দিয়েছেন।
কাজীম উদ্দিন বলেন, ‘যে গ্রাহক বিমার টাকা পাওয়ার আগে সন্দেহে থাকেন, তিনি যখন নির্ধারিত সময়ে নিজের হাতে টাকা পান, তখন তার আস্থা তৈরি হয়। শুধু সেই একজন নয়, আশপাশের আরও অনেক মানুষের মধ্যেও বিমার প্রতি বিশ্বাস বাড়ে।’
তিনি বলেন, একটি কোম্পানি সময়মতো দাবি পরিশোধ করলে তার ইতিবাচক প্রভাব অন্য গ্রাহকদের ওপরও পড়ে। অন্যদিকে কয়েকটি কোম্পানি বছরের পর বছর গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ না করায় পুরো শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তার মতে, দেশের সব বিমা কোম্পানি যদি সময়মতো গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের বিমা খাতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেক বেশি।
গণমাধ্যম প্রতিপক্ষ নয়, খাতের সহযোগী
বিমা খাত ও সাংবাদিকতা একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোগী বলেও মন্তব্য করেন ন্যাশনাল লাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সংবাদ একটি প্রতিষ্ঠানকে আরও সতর্ক ও জবাবদিহিমূলক করে। খাতের অনিয়ম, সমস্যা ও গ্রাহকদের অভিযোগ তুলে ধরা যেমন জরুরি, তেমনি ইতিবাচক পরিবর্তন, নতুন প্রযুক্তি ও গ্রাহকসেবার উন্নতিও মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
কাজীম উদ্দিন বলেন, বীমা কোম্পানি ও সাংবাদিকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকা জরুরি। তথ্যের অভাব বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে যেন বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সেদিকেও সবাইকে নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম শক্তিশালী আর্থিক খাত গঠনের অন্যতম সহায়ক শক্তি। এ কারণেই ন্যাশনাল লাইফ অতীতের মতো ভবিষ্যতেও আইআরএফের দক্ষতা ও জ্ঞান বৃদ্ধির উদ্যোগে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার, সুশাসন, স্বচ্ছতা, উন্নত গ্রাহকসেবা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের বিমা খাতকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি ও সাংবাদিক সমাজকে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
কাজীম উদ্দিন বলেন, ‘বিমা খাতের চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাও অনেক। আমরা যদি সময়মতো গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করতে পারি এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করি, তাহলে বাংলাদেশের বিমা শিল্প আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে।’