সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার ভুয়া ঋণ
প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার বিরুদ্ধে ভুয়া সেলস কন্ট্রাক্ট, জাল ব্যাক টু ব্যাক এলসি ও অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের মাধ্যমে ২৬টি রপ্তানিমুখী গার্মেন্টের নামে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার ভুয়া ঋণ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা সংকটে রয়েছে বলে দাবি করেছেন ওই ২৬ গার্মেন্টের মালিকরা।
ভুক্তভোগীরা বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যাক টু ব্যাক এলসি খুলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল এসব অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এসব অনিয়ম হলেও ব্যাংকের অডিট ও বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শনে উঠে আসেনি। এখন হুট করে আমাদের নামে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই দেশের স্বনামধন্য অডিট ফার্ম দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সঠিক দায়-দেনা বের করতে হবে, তা না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কারণ, দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাদে বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
শনিবার বেলা ১১টায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনার পর ২০১৭ সাল থেকে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ভুয়া আইডি ব্যবহার করে জাল সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি করেন। এসব কাগজের ভিত্তিতে একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়, যদিও বাস্তবে কোনো কাঁচামাল আমদানি হয়নি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এলসির দায় সমন্বয়ের নামে চলতি হিসাব ব্যবহার করে অবৈধভাবে ডলার কেনা হয়েছে। বাজারদরের চেয়ে ১২ থেকে ১৫ টাকা বেশি দামে ডলার কিনে প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরে এসব দায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ঋণ হিসেবে দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অনুমতি ছাড়াই ফোর্সড লোন ও ডিমান্ড লোন তৈরি করে সুদ আরোপ করা হয়েছে।
তারা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন লঙ্ঘন করে চলতি হিসাব, নগদ জমা ও ঋণের মাধ্যমে এলসি সমন্বয় করা হয়েছে। তবে বারবার হিসাব চাইলেও ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেয়নি। কিছু ক্ষেত্রে ফাঁকা চেক ব্যবহার করে অর্থঋণ আদালতে মামলাও করা হয়েছে। এছাড়া ঋণ পুনঃতফসিলের শর্তে স্বাক্ষর না করলে এলসি ও অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধা বন্ধের হুমকি দেওয়া হতো। এতে কারখানার উৎপাদন, শ্রমিকদের বেতন ও স্বাভাবিক কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়ে। পরে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে পুনঃতফসিলে রাজি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা বাতিল করে দেয়। এর ফলে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বড় কোনো অস্বাভাবিক দায় ছিল না। কিন্তু ২০২৪ সালে হঠাৎ কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ দেখানো হয়, যা অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক। এজন্য ফরেনসিক অডিটের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চান তারা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডোয়সা ল্যান্ড অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, ঋণের অঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে ঋণের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৮১ কোটি টাকা, পরে তা চার হাজার ২০০ কোটি বলা হয়। সম্প্রতি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান চার হাজার ৮০০ কোটি টাকার কথা বলেন। কিন্তু এত অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়?
তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানের নামে রপ্তানির বিপরীতে অনুমোদিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি এলসি খোলা হয়। যেখানে এক কোটি ৯২ লাখ ডলারের রপ্তানির বিপরীতে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ এলসি খোলার সুযোগ ছিল, সেখানে প্রায় ছয় কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এতে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ও সাবেক চেয়ারম্যান লাভবান হয়েছেন।
নিট রিফ্লেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিল মোহাম্মদ ইমরান বলেন, শুরুতে আমার ঋণসীমা ছিল চার কোটি টাকা, যা পরে ৪০ কোটিতে উন্নীত করা হয়। পরে দেখতে পায়, অ্যাকাউন্টে অতিরিক্ত টাকা জমা ও উত্তোলন হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে ব্যাংক কর্মকর্তারা কোনো সমস্যা নেই বলে আশ্বস্ত করেন। এরপর আমার প্রতিষ্ঠানের নামেও বিশাল অঙ্কের ঋণ দেখানো হয়।
ওয়েস্ট অ্যাপারেলসের পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, কোনো প্রকৃত বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছাড়াই ভুয়া সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি করে এলসি খোলা হতো। এরপর ব্যবসায়ীদের অনুমতি ছাড়াই অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেখিয়ে উচ্চমূল্যে ডলার কেনা হয় এবং সেই দায় প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো হয়।
টোটাল ফ্যাশনের মেহরাব বিন হাসিব বলেন, ২০২২ সালে আমার প্রতিষ্ঠানের দায় ছিল ৪৮ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৩ সালে হঠাৎ ৩৬০ কোটি টাকা দায় দেখানো হয়, যদিও অনুমোদিত ঋণসীমা ছিল মাত্র ৫০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান বলেন, ব্যাংক একটি ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করছে। অডিট প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রকৃত দায়ীদের বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।