নামমাত্র জনবল দিয়ে শত শত কোম্পানির নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে কয়েকটি অডিট ফার্ম। ২০২৫ করবর্ষে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ৩৫০ থেকে ৬০০টির মতো কোম্পানির অডিট করেছে। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে একের অধিক কোম্পানির নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে ফার্মগুলো। এর মধ্যে পাবলিক ইন্টারেস্ট এনটিটি (পিআইই) রয়েছে নিরীক্ষা তালিকায়। শুধু জনবলের স্বল্পতাই নয়, এসব জনবলের দক্ষতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এসব ফার্মের নিরীক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ফার্মগুলোর অংশীদারদের দাবি, সংখ্যায় বেশি হলেও নিরীক্ষা করা কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই ছোট ও ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তাই নিরীক্ষার সংখ্যা নয়, গুণগত মানই বিবেচ্য। প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে মান বজায় রেখেই নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন বলে দাবি তাদের।
এদিকে চলতি করবর্ষে ওইসব ফার্মকে পিআইই অডিট থেকে বিরত রেখেছে নিরীক্ষা ফার্ম ও নিরীক্ষকদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। পাশাপাশি এসব ফার্মের নিরীক্ষা করা পিআইইগুলোর মধ্যে প্রতিটি ফার্মের দুটি করে নিরীক্ষা প্রতিবেদন যাচাই করছে সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত করবর্ষে সাড়ে ৩৫০টির বেশি কোম্পানির নিরীক্ষা করেছে—এমন ১১টি ফার্মকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ফার্ম পাঁচ শতাধিক কোম্পানির অডিট করেছে। ফার্মগুলো হলো কে এস আর অ্যান্ড কোং, জাভেদ মৃধা অ্যান্ড কোং এবং এম আহমেদ অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। এসব ফার্মের নিরীক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত জনবল গড়ে ১৫ জনেরও কম।
এ ছাড়া ৪০০টির বেশি কিন্তু ৫০০টির কম কোম্পানির নিরীক্ষা করেছে মোহাম্মদ শাহেদুল্লাহ অ্যান্ড কোং, হুদা হোসেন অ্যান্ড কোং এবং বি মাকসুদা অ্যান্ড কোম্পানি। এসব ফার্মে জনবল রয়েছে ১৫ থেকে ২০ জন।
অন্যদিকে, ৩৫০টির বেশি কিন্তু ৪০০টির কম কোম্পানির নিরীক্ষা করেছে নাসির মোহাম্মদ অ্যান্ড কোং, আহমেদ জাকের অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস, সরদার মোরশেদ অ্যান্ড কোং, এইচ এম এনাম অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এবং কুদরাতে খোদা অ্যান্ড কোং। এসব ফার্মের মধ্যে আহমেদ জাকের অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের আড়াইশর বেশি হলেও অন্যান্য ফার্মের জনবল সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। তালিকায় থাকা এসব ফার্ম উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পিআইইর বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের নিরীক্ষা কাজ সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে ৩০ জনের মতো জনবল দিয়ে একটি ফার্ম ৮০টির মতো পিআইইর অডিট সম্পন্ন করেছে।
এ বিষয়ে এফআরসির নির্বাহী পরিচালক তারেক কামাল আমার দেশকে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এফআরসি মূলত পিআইইর নিরীক্ষার মান যাচাই করতে পারে। কয়েকটি ফার্মের নিরীক্ষা প্রতিবেদন যাচাই করা হচ্ছে। ত্রুটি পাওয়া গেলে জরিমানাসহ পিআইইর নিরীক্ষায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনি বিধান রয়েছে। বড় ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলাও করা যেতে পারে। স্বল্প জনবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক কোম্পানির নিরীক্ষার কারণে ফার্মগুলোকে চলতি করবর্ষে পিআইই অডিট থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত কম জনবল দিয়ে এক বছরে শত শত কোম্পানির নিরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন করা অসম্ভব। নিরীক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ধরন, শিল্প ও বাজার পরিস্থিতি, আইনগত ও নিয়ামক কাঠামো, হিসাবরীতি ও আর্থিক নীতি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ও সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। এ জন্য একটি কোম্পানির নিরীক্ষায় কমপক্ষে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবলও অপরিহার্য। ফলে এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক কোম্পানির নিরীক্ষা বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কিছু ফার্ম যথাযথ নিরীক্ষার পরিবর্তে সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে অডিট প্রতিবেদন তৈরি করেছে, যা মূলত নিরীক্ষার নামে স্বাক্ষর-বাণিজ্যের শামিল।
তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানের সঠিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশ ও আর্থিক বিবরণীর সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী ও অংশীদারদের আস্থা তৈরি হয়। পাশাপাশি হিসাবের ভুল, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। নিরীক্ষার মান বজায় না থাকলে এসব উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ও অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল আমিন আমার দেশকে বলেন, একটি ফার্মের জনবল ও সক্ষমতার ভিত্তিতে এক করবর্ষে কতটি কোম্পানির নিরীক্ষা করা যাবে, সে বিষয়ে নীতিমালা থাকা উচিত। প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ছাড়াই বিপুলসংখ্যক কোম্পানির নিরীক্ষা করা হলে সেগুলোর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের পরিচালক মোস্তফা কামাল আমার দেশকে বলেন, একটি অডিট ফার্ম কতটি কোম্পানির নিরীক্ষা করতে পারবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। ফার্মগুলো নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী নিরীক্ষা করতে পারে। সংখ্যাটি যতই হোক, গুণগত মান রক্ষা হচ্ছে কি না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যা কম হলেই নিরীক্ষার মান ভালো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে গুণগত মান নিয়ে অভিযোগ পেলে তা যাচাই করে দেখা হয়। অনিয়ম বা ব্যত্যয় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ফার্ম ও নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নিরীক্ষার মান নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে কে এস আর অ্যান্ড কোম্পানির কাজী সাইদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করেই তাদের ফার্ম নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সীমিত থাকায় সংখ্যায় বেশি কোম্পানির নিরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। কোনো ব্যত্যয় থাকলে এফআরসি ও আইসিএবির কাছ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার আশা করছেন তারা। অর্থের বিনিময়ে অডিটের বিষয়ে তিনি বলেন, এর কোনো সত্যতা নেই। আমাদের মতো ছোট ফার্মগুলো নানা ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্যে কোনো রকমে টিকে আছে।
কাজী সাইদুর রহমান বলেন, দেশে প্রায় ১০ লাখ প্রতিষ্ঠান থাকলেও অডিট ফার্ম রয়েছে ৩৬৭টি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা হচ্ছে না। অডিট না হওয়ার কারণে সেগুলো থেকে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না। সব প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষার আওতায় আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অন্যদিকে, হুদা হোসাইন অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের অংশীদার আমিনুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, নিরীক্ষার সংখ্যা দিয়ে এর গুণগতমান বিচার করা যায় না। তাদের নিরীক্ষা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন, টার্নওভার ও সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলক কম। একটি ব্যাংকের একটি শাখার টার্নওভারের চেয়েও তাদের নিরীক্ষা করা সব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত টার্নওভার কম হতে পারে। সে বিবেচনায় ব্যাংকের নিরীক্ষায় ব্যবহৃত জনবলের চেয়ে তাদের ফার্মের জনবল কম নয় বলেও দাবি করেন তিনি।