হোম > বাণিজ্য > ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ফের পুরোনো ধারায় ফেরার চিন্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

রোহান রাজিব

নানা ধরনের ছাড় দেওয়ার পরও কমছে না খেলাপি ঋণ। তাই কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমাতে আবারও পুরোনো ধারায় ফেরার কথা ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে কোনো ঋণের নির্ধারিত কিস্তির সময় পার হওয়ার পরদিন থেকেই সেটিকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তিন মাস পর ঋণটি খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়।

তবে মেয়াদি ঋণের (টার্ম লোন) ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের মতো খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণের সময়সীমা আরো ছয় মাস বাড়ানোর কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে কার্যত কোনো ঋণ ৯ মাস মেয়াদোত্তীর্ণ থাকার পর খেলাপি হবে। বর্তমানে তিন মাস কিস্তি পরিশোধ না করলেই ঋণ খেলাপি হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

গত ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সরকারি ও বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠকে এ পরিকল্পনার বিষয়টি তুলে ধরেন। এ সময় তিনি ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের মতামত নেন। বৈঠকে রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ব্যাংকের একজন চেয়ারম্যান বলেন, ‘ব্যাংক খাতের বর্তমান খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনা করেন গভর্নর। এ সময় বর্তমান নীতিমালা পরিবর্তন করে সাময়িকভাবে আগের নীতিমালায় ফিরে যাওয়ার কথা বলেন। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবির কথাও জানান তিনি। এরপর ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের কাছে মতামত চান। এ সময় রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল হুদা সাময়িকভাবে আগের ধারায় ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে বাকিরা কোনো মতামত দেননি।’

জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে আন্তর্জাতিক চর্চা থেকে সরে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৯ সালের এপ্রিলে ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালা পরিবর্তন করে ঋণকে ‘নিম্নমান’, ‘সন্দেহজনক’ ও ‘মন্দ বা কুঋণ’ হিসেবে চিহ্নিত করার সময়সীমা প্রতি ধাপে তিন মাস করে বাড়ানো হয়।

তখন বলা হয়েছিল, কোনো ঋণ অপরিশোধিত থাকার ৯০ দিন পার হলে সেটি মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে গণ্য হবে। এরপর মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ আরো ২৭০ দিন পার হওয়ার পর খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হবে। এভাবে সব শ্রেণির খেলাপি ঋণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া হয়। ওই সময়ে ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালার পরিবর্তনের ফলে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমতে থাকে। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১০.৩০ শতাংশ। ২০১৯ সালের মার্চে তা বেড়ে হয় ১১.৮৭ শতাংশ। এরপর এপ্রিলে নীতিমালায় ছাড় দিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এরপর ওই বছরের জুনে খেলাপি ঋণের হার কমে ১১.৬৯ শতাংশ হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের হার ছিল যথাক্রমে ১১.৯৯ শতাংশ ও ৯.৩২ শতাংশ। আর ২০২০ সালের মার্চে তা আরো কমে ৯.০৩ শতাংশে নামে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতের গোপন খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম কঠোর করে। নতুন নীতিমালায় আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরদিন থেকেই ঋণকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে গণ্য করার ব্যবস্থা চালু করা হয়। আর ৯০ দিন মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলেই ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়।

তখন বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নতুন নীতিমালা জারি করা হয়েছে। ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাত সংস্কারে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

নতুন নীতিমালা কার্যকরের পর ২০২৫ সালের জুনে প্রথমবারের মতো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। পরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তা আরো বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এরপর ডিসেম্বর প্রান্তিকে কিছুটা কমে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।

তবে বিশেষ সুবিধা নেওয়া কিছু ঋণগ্রহীতা পরবর্তী সময়ে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে মার্চে খেলাপি ঋণ আবার বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আর জুন শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। জানা গেছে, আগের নীতিমালায় ফিরলে ব্যাংক খাতের বর্তমান খেলাপি ঋণের হার ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মেয়াদি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৪৭ শতাংশই মেয়াদি ঋণ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন করে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণের সময়সীমা বাড়ানো হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যের পরিবর্তে বাংলাদেশ আবার তুলনামূলক শিথিল ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাবে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপি ঋণের চাপ কিছুটা পরে হিসাবের খাতায় উঠে আসবে।

ব্যাংকাররা জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে আগেও এ ধরনের নীতিমালা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে প্রকৃত কোনো লাভ হয়নি। বরং খেলাপি ঋণ আড়াল হয়ে গেছে এবং ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আসেনি। একই সঙ্গে খেলাপি গ্রাহকদের বিরুদ্ধে সময়মতো যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব হয়নি। তাদের মতে, নতুন করে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে খেলাপি ঋণ আবারও ‘কার্পেটের নিচে লুকিয়ে’ রাখা হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাতের সংকট আরো বাড়তে পারে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, নীতিমালা পরিবর্তন করে সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণ কম দেখানো সম্ভব হলেও এতে ব্যাংক খাতের প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এটি অনেকটা মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকে আইসিইউ বা ভেন্টিলেটরে রেখে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার মতো। দেশের ভেতরে খেলাপি ঋণের হিসাব কম দেখানো গেলেও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা বিদেশি ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ীই ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করবে। ফলে বাস্তবে কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এ ধরনের কোনো নীতিমালা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তার জানা নেই। তবে খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। এর অর্থ খেলাপি ঋণ ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ করে বা কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রেখে কমানো হবে না।

বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম

নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩৭৫, নিখোঁজ সাড়ে ৫ হাজার

রাজধানীতে বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস

কুলিয়ারচরে হালচাষের ট্রাক্টর উল্টে চালকের মৃত্যু

বন্যায় নিশ্চিহ্ন চীন-নেপাল সীমান্তের ব্যস্ত বন্দর

কম খরচে আনারকলির বাম্পার ফলন

নতুন করে হামলা হলে জবাব হবে কঠোর ও বেদনাদায়ক: ইরান

পাকিস্তানকে কোচিং করানোর ইচ্ছা থাকলেও ‘হট সিটে’ ভয় মুশতাকের

যুদ্ধের অর্থ জোগাতে পর্নোগ্রাফি বৈধ করতে চায় ইউক্রেন

চুয়াডাঙ্গায় অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাই