গ্রাহকদের সঞ্চয়ের নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা থাকলেও দেশের বীমা খাতে আস্থার সংকট এখন তীব্র। মেয়াদপূর্তির পরও বছরের পর বছর ঘুরে নিজেদের জমানো টাকা পাচ্ছেন না বহু গ্রাহক। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ৩৫টি জীবন বীমা কোম্পানির কাছে গ্রাহকের অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪,৬৬০ কোটি টাকা। সাধারণ বীমা খাতেও বকেয়া দাবির পরিমাণ ৩,৪৪৮ কোটি লাখ টাকা।
এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ ও আস্থা ফেরাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। ইতোমধ্যে তিন দফায় ১৬ হাজারের বেশি গ্রাহকের প্রায় ৬৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বকেয়া দাবি মেটাতে কয়েকটি কোম্পানির সম্পদ নগদায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ উদ্যোগকে ইতিবাচক বললেও বিপুল পরিমাণ বকেয়া পরিশোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ আমার দেশকে বলেন, গ্রাহকের দাবি পরিশোধে আইডিআরএর উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এ প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে চালু রাখা যাবে কি নাÑতা দেখতে হবে। শুধু কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ বকেয়া দাবি মেটানো সম্ভব নয়। এ জন্য আইডিআরএর স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ব্যক্তি গ্রাহকের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কী করবে, তাও পরিষ্কার করা দরকার।
জানা গেছে, বীমা পলিসি খোলার সময় কোম্পানির এজেন্টরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে উচ্চ মুনাফা ও আর্থিক নিরাপত্তাসহ নানা লোভনীয় সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কিংবা দুর্ঘটনাজনিত কারণে দাবি উত্থাপন করলে শুরু হয় হয়রানি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কোম্পানির আঞ্চলিক ও প্রধান কার্যালয়ে ঘুরেও অনেকে টাকা পাচ্ছেন না। এতে চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও বিয়ের মতো জরুরি ব্যয় মেটাতে বিপাকে পড়ছে বহু পরিবার। ফলে মাঠ পর্যায়ে বাড়ছে গ্রাহকের ক্ষোভ ও অসন্তোষ, প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে পুরো খাতের ভাবমর্যাদা।
আইডিআরএর সূত্র অনুযায়ী ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) অনিরীক্ষিত দাবিসংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুন শেষে দেশের ৩৫টি জীবন বীমা কোম্পানির মোট দাবি ছিল ৬,৭৬৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২,১১২ কোটি ৯৯ লাখ টাকার দাবি নিষ্পত্তি করেছে কোম্পানিগুলো। ফলে অনিষ্পন্ন থেকে গেছে ৪,৬৬০ কোটি ৮০ লাখ টাকার দাবি।
জীবন বীমা খাতে বকেয়া দাবির ক্ষেত্রে সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। এ তালিকার শীর্ষে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড।
সাধারণ বীমা খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশের ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানির কাছে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) মোট দাবি ছিল ৩,৯৬৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে তিন মাসে মাত্র ৫১৯ কোটি ৩২ লাখ টাকার দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে। জুন শেষে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩,৪৪৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
আইডিআরএর উদ্যোগ
গত ১৮ জুন আইডিআরএর চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেওয়ার পর মীর নাদিয়া নিভিন বীমা খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ এবং গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ নেন। এরই মধ্যে তিন দফায় ১৬ হাজার ৫৮ গ্রাহককে ৬৩ কোটি ৯১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩০ টাকার বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। চতুর্থ পর্যায়ে আগামী ২৪ বা ২৬ অক্টোবর আরো গ্রাহকের দাবি পরিশোধের কথা রয়েছে।
আইডিআরএর আশা, বকেয়া দাবি পরিশোধের এ কার্যক্রম দীর্ঘদিনের অনাস্থা কাটিয়ে গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে বৈধ দাবি দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে পলিসিধারীদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি বাড়ানো সম্ভব হবে।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন সম্প্রতি আমার দেশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা আস্থার সংকট, তথ্য গোপনের অপচেষ্টা ও দীর্ঘমেয়াদি বকেয়া দাবির বেড়াজালে দেশের বীমা খাত স্থবির হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনিয়ম দূর করে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনাই লক্ষ্য। এক্ষেত্রে বকেয়া দাবি পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গোপনে সার্ভার সরিয়ে রাখা কিংবা ভুয়া তথ্য দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে আর পার পেতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, বকেয়া দাবি পরিশোধে কোম্পানির সম্পদ নগদায়নের জন্য চারটি উৎস বিবেচনা করা হচ্ছে। এগুলো হলো—ভালো ব্যাংকে থাকা স্থায়ী আমানত (এফডিআর), সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিক্রিযোগ্য জমি ও অন্যান্য বিনিয়োগ। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান খোঁজা হবে।