হোম > বাণিজ্য > পুঁজিবাজার

অস্তিত্বের সংকটে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক

পুঁজিবাজারে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা

কাওসার আলম ও আবু আলী

আমার দেশ গ্রাফিক্স

শেয়ারবাজারে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কারণে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো বড় ধরনের অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের শাখা অফিস গুটিয়ে নিয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করে অফিস স্পেস কমানোসহ জনবল কাটছাঁট করে কোনো রকমে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এমনকি শেয়ারবাজার পরিচালনাকারী প্রধান প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) নিজেও তাদের পরিচালন ব্যয় মেটাতে পারছে না। শেয়ারবাজার পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামীতে আরো কঠিন ও গভীর সংকটের মুখে পড়তে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর শেয়ারবাজার পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নতি হবে বলে অনেকেই আশা করেছিলেন। কিন্তু গত আড়াই বছরে একটি কোম্পানিও শেয়ারবাজারে নতুন করে তালিকাভুক্ত হয়নি। এটিকে শেয়ারবাজারের জন্য সবচেয়ে বড় ধরনের সংকট বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। অবশ্য বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান খুব দ্রুতই বাজারে ভালো ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন; সেজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন। বাজার বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন না ঘটলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না; সেজন্য দ্রুত ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে নিয়ে আসতে হবে।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মূল আয়ের প্রধান উৎসই হচ্ছে শেয়ারবাজারের দৈনন্দিন লেনদেন থেকে প্রাপ্ত কমিশন। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় ও নিয়মিত খরচ মেটাতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা লেনদেন হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমানে সে লেনদেন কমে গিয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার ঘরে অবস্থান করছে, যা চাহিদার তুলনায় মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। এ অবস্থায় কোনোমতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নিরন্তর লড়াই করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। খরচ কমাতে শাখা অফিস বন্ধ ও দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি সঞ্চিত রিজার্ভ ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মিটিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করা হলেও সেই রিজার্ভের অর্থও ফুরিয়ে গেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরো বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হবে এবং পুরো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন।

নিকুঞ্জে অবস্থিত ডিএসই টাওয়ারে এক সময় পুঁজিবাজার মধ্যস্থতাকারী প্রায় ১২০ প্রতিষ্ঠানের অফিস পরিচালিত হতো। সেখান থেকে অনেকেই অফিস গুটিয়ে নেওয়ায় বর্তমানে মাত্র ৬৫ প্রতিষ্ঠানের অফিস অবশিষ্ট রয়েছে এবং তাদের মধ্যেও অনেকেই ডিএসই টাওয়ারের ভবন থেকে অফিস গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

মতিঝিলের পুরোনো ডিএসই ভবনসংলগ্ন পপুলার ভবনে আগে একটি ছোট্ট রুম পাওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও মন্দার কারণে এখন সেখানকার প্রায় ৩০ শতাংশ অফিস স্পেস ফাঁকা পড়ে আছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শীর্ষ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, লেনদেন না বাড়লে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম জানান, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে হলে শেয়ারবাজারের লেনদেন তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করতে হবে এবং প্রতিবছর ভালো মানের ১০-১২টি আইপিও বাজারে আনতে হবে; অন্যথায় ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।

সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে ডিএসইর শীর্ষ একটি ব্রোকারেজ হাউসের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০১৩ সালের পর থেকেই মন্দার কারণে তাদের প্রতিষ্ঠান ধুঁকতে শুরু করে। এক সময়ের পাঁচ হাজার বর্গফুটের বিশাল অফিস এখন সংকুচিত করা হয়েছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৫২ থেকে নামিয়ে মাত্র ২৫ জনে আনা হয়েছে। তিনি জানান, বাজার খারাপ থাকায় সঞ্চিত রিজার্ভ থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে হয়েছে। সেই সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অফিসের পরিসর ছোট করার পাশাপাশি কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে তিনি প্রবল আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

শীর্ষ একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা জানান, ২০১০ সালের ধসের পর তাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না এবং বাধ্য হয়ে কর্মীদের চাকরিচ্যুত করতে হয়েছে বা ব্যাংকে স্থানান্তর করতে হয়েছে। ডিএসই টাওয়ারের বিশাল অফিস গুটিয়ে ফেলা আরেক মার্চেন্ট ব্যাংকের সিইও জানান, মন্দার কারণে দীর্ঘদিন পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি বন্ধ থাকায় অনেকেই বাজার ছেড়েছেন বা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। ডিএসইর সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা এগোতে পারছি না; ট্রেডিং বাড়াতে ডিএসইকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, শুধু বিএসইসির দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো প্রসঙ্গে এআইবিএল ক্যাপিটাল মার্কেট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউর রহমান জানান, আস্থা ফেরাতে ভালো শেয়ার সরবরাহের বিকল্প নেই, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানি বাজারে আনতে হবে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট ও লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সিইও ইফতেখার আলম বলেন, পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে হবে এবং ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হলে শেয়ারবাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরবে।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, দেড় দশকে শেখ হাসিনার আমলে সংঘটিত নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, কারসাজি ও লুটপাটে দেশের শেয়ারবাজার বড় সংকটে পড়েছে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর শেয়ারবাজারকে নানাভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহল ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। তারা বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি হবে না—এমন আশ্বাসের মাধ্যমে প্রলুব্ধ হয়ে ন্যূনতম ধারণা ছাড়াই অল্প সময়ে ধনী হওয়ার লোভে লাখ লাখ মানুষ বাজারে বিনিয়োগ করে। এতে বিও অ্যাকাউন্ট খোলার হিড়িক পড়ে, ব্রোকারেজ হাউসগুলো জেলা ও উপজেলায় শাখা খোলে এবং দৈনিক লেনদেন ১৫০-২০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা তাদের আয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

তবে ২০১০ সালের ভয়াবহ ধসে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হন। এই ধসের পর ‘মার্জিন লোন’ বড় সংকট তৈরি করে। নিয়মানুযায়ী ‘ফোর্সড সেল’ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিএসইসির মৌখিক নির্দেশে তা বন্ধ রাখা হয়। ফলে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার মার্জিন লোনে আটকে আছে, যাকে বিশ্লেষকরা শেয়ারবাজারের ‘ক্যানসার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। মার্জিন লোন আদায় না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ইকুইটি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে এবং বারবার সময় পেয়েও তারা প্রভিশনিং করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

২০১০ সালের ধসের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেনকে বিএসইসির চেয়ারম্যান করা হয়। তবে তিন মেয়াদে টানা ৯ বছর দায়িত্বে থেকে তিনি মানহীন, দুর্বল ও সাইনবোর্ডসর্বস্ব কোম্পানি তালিকাভুক্ত করে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেন। এসব কোম্পানির অধিকাংশই লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ধরনের কাগুজে শেয়ারে বিনিয়োগ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিপুল আর্থিক ক্ষুতির মুখে পড়েছেন।

খায়রুল হোসেনের পর নিয়োগ পান একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম। আইপিও মাকের্টের পাশাপাশি সেকেন্ডারি মার্কেটকেও ধ্বংস করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেকেন্ডারি মার্কেটকে জুয়ার বাজারে পরিণত করেন তিনি। আইন ভেঙে নিজের ও পরিবারের নামে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন। কারসাজি চক্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। বর্তমানে শিবলী রুবাইয়াত দুর্নীতির মামলায় কারাগারে।

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী আমার দেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে দেশের শেয়ারবাজার ‘গার্বেজ রেগুলেশনে’ ছিল।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনার আমলে পুঁজিবাজার থেকে এক লাখ কোটি টাকা লুট ও পাচার হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ আমলের এই ভয়াবহ দুর্নীতি, লুটপাট ও পাচারের কারণেই আজ পুরো শেয়ারবাজার ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

শেয়ারবাজারে বড় দরপতনে সূচক নামল সাড়ে ৫ হাজারের নিচে

শেয়ারবাজার প্রায় অকার্যকর, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিকল্প নেই

ডিম্যাট করা যাবে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারও

পুঁজিবাজারে ডেরিভেটিভস চালুর উদ্যোগ: ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ডিএসইর

সিএসইর কমোডিটি মার্কেট চালুর জট খুলছে

দরপতনে ধুঁকছে শেয়ারবাজার

আ.লীগ আমলে শেয়ারবাজার ছাড়েন ৫০ হাজার বিনিয়োগকারী

বিও হিসাব খোলায় চালু হচ্ছে ই-কেওয়াইসি

নানা অনিয়মে বড় ধরনের তদন্তের মুখে ডিএসই

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর