২০১০ সালের অক্টোবর থেকে দেশের শেয়ারবাজারে পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কাগুজে শেয়ার লেনদেন। এর পরিবর্তে ইলেকট্রনিক বা ডিম্যাট আকারে শেয়ার লেনদেন হচ্ছে। ফলে তখন থেকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির অন্যতম শর্তই হচ্ছে কোম্পানির শেয়ার হতে হবে ইলেকট্রনিক বা ডিম্যাট আকারে। বাংলাদেশে সব ইলেকট্রনিক বা ডিম্যাট শেয়ার কেন্দ্রীয়ভাবে সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) ডেটাবেজে ইলেকট্রনিক বুক-এন্ট্রি হিসেবে সংরক্ষিত থাকে।
আগামীতে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারও ডিম্যাট আকারে রূপান্তর করা যাবে। অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার ডিম্যাট আকারে রূপান্তরে ফি নির্ধারণসহ সার্বিক বিষয়গুলো পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে সিডিবিএল। বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল মোতালেব আমার দেশকে বলেন, ডিম্যাট আকারে রূপান্তর হলে শেয়ার হারানো, নষ্ট হওয়া কিংবা শেয়ার জাল করার কোনো ধরনের ঝুঁকি থাকবে না। এছাড়া যেসব কোম্পানির শেয়ার ডিম্যাট আকারে রূপান্তরিত হবে সেসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে থাকবে। ব্যবসায় সহজীকরণ ও ডিরেগুলেশনে সরকারের যে প্রতিশ্রুতি তা বাস্তবায়নে এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন তিনি।
ফি নির্ধারণের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুল মোতালেব বলেন, এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। এখনই এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফি নির্ধারণের বিষয়টি প্রথমে বোর্ডে অনুমোদনের পর বিএসইসিতে পাঠানো হবে। বিএসইসির অনুমোদন পেলে তা কার্যকর হবে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার ও করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট, সরকারি যেসব ট্রেজারি বিল বা বন্ড রয়েছে সেগুলোর সবই ইলেকট্রনিক আকারে রয়েছে। তবে লেনদেন হয় না কিন্তু শেয়ারবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সিডিবিএলের শেয়ার ইলেকট্রনিক আকারে রয়েছে। এছাড়া বেমেয়াদি যেসব ফান্ড রয়েছে সেগুলোর ইউনিটও ডিম্যাট আকারে রয়েছে। কিন্তু শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট নয়, এমন কোনো কোম্পানির শেয়ার ডিম্যাট আকারে নেই। ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের কোম্পানির শেয়ারই যাতে ডিম্যাট আকারে রূপান্তর করা যায় সে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সিডিবিএল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড বা অন্যান্য সিকিউরিটিজকে স্বতন্ত্রভাবে শনাক্ত করতে ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিজ আইডেন্টিটি নাম্বার (ISIN) থাকে। আইসিন একটি বিশ্বজনীন কোড, যা ISO 6166 স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী তৈরি। এটি ১২ অক্ষরের একটি নির্দিষ্ট আলফানিউমারিক (ইংরেজি অক্ষর ও সংখ্যার সমন্বয়ে গঠিত) কোড, যা বিশ্বের যেকোনো শেয়ার বাজারে নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির ব্যবহৃত হয়। এর প্রথম দুটি অক্ষর দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশ নির্দেশ করা হয় (যেমন—বাংলাদেশের কোম্পানির ক্ষেত্রে কোডের শুরুতে BD থাকে), এরপরের ৯টি অক্ষর বা সংখ্যা সিকিউরিটিজটির নিজস্ব জাতীয় পরিচয় বহন করে এবং শেষ অঙ্কটি একটি চেক ডিজিট হিসেবে কাজ করে। শেয়ার কেনাবেচা, সেটেলমেন্ট বা লেনদেন নিষ্পত্তি এবং ডিমেট অ্যাকাউন্টে সিকিউরিটিজ সঠিকভাবে ট্র্যাক করার জন্য এই নম্বরটি অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে সিডিবিএল হলো ন্যাশনাল নাম্বারিং এজেন্সি (এনএনএ), যারা নির্দিষ্ট নিয়ম ও আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড (ISO 6166) অনুসরণ করে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সিকিউরিটিজগুলোকে এই আইসিন নম্বর দিয়ে থাকে। শেয়ার ডিম্যাট করলে আগামীতে অ-তালিতাকাভুক্ত কোম্পানিও আইসিন নাম্বারধারী হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কোন কোম্পানির শেয়ার ডিম্যাট করতে হলে আগে আইসিন নিতে হবে। এ জন্য নির্ধারিত ফরম পূরণ ও ফি জমা দিতে হবে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ও সিকিউরিটিজের ধরণ অনুযায়ী ৫,০০০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ফি পরিশোধ করতে হয়। তবে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির ফি নির্ধারণের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফি নির্ধারিত হলে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে ওই ফি পরিশোধ করে আবেদন করতে হবে। প্রতি বছরই এ ফি পরিশোধ করতে হবে।
আইসিন পাওয়ার পর কোম্পানির পরিচালকরা তাদের নামে থাকা শেয়ার ডিম্যাটে রূপান্তর করতে পারবেন। যদি পরিচালকদের আগে থেকে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্ট না থাকে তাহলে সিডিবিএল কিংবা অনুমোদিত ডিপোজিটরি পার্টিসিপেন্টে (ডিপি) (ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক) বিও অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। তারপর আইসিন ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ডিপির নিকট ফিজিক্যাল শেয়ার সার্টিফিকেট ডিম্যাটে রূপান্তরে আবেদন করবেন কোম্পানির পরিচালক।
ডিপি ও কোম্পানির শেয়ার ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে আবেদনটি সিডিবিএলের কেন্দ্রীয় সিস্টেমে প্রসেস করা হয়। এরপর আইসিন নম্বরের পরিচিতির ওপর ভিত্তি করে ফিজিক্যাল শেয়ারগুলো বিলুপ্ত হয়ে, সিডিবিএলের ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে সরাসরি সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের নিজ নিজ ব্যক্তিগত বিও অ্যাকাউন্টে ইলেকট্রনিক বা ডিম্যাট ব্যালেন্স হিসেবে জমা হয়ে যাবে। ডিম্যাট আকারে রূপান্তরির হলে কাগুজে শেয়ার সংরক্ষণের ঝুঁকি ও নানা বিড়ম্বনা থেকে রেহাই মিলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক সময় দেশের শেয়ারবাজারে কাগুজে শেয়ারের লেনদেন হতো। কাগুজে শেয়ার লেনদেনে নানা ধরনের ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হতো। মালিকানা পরিবর্তনের সার্টিফিকেট পেতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেত। শেয়ার ট্রান্সফারে স্ট্যাপ ডিউটিসহ নানা দাপ্তরিক খরচ ও প্রচুর পরিমাণ কাগজের দলিলাদির প্রয়োজন হতো। আবার শেয়ার হারিয়ে যাওয়া কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তো রয়েছেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে শেয়ার জালের ঘটনা। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে প্রথম কেলেঙ্কারির ঘটনায় জাল শেয়ার বেচাকেনার বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শেয়ারবাজারকে কাগজের লেনদেন থেকে বের করে আনতে ২০০০ সালে সিডিবিএল গঠন করা হয় এবং ২০০৩ সাল থেকে এটির কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৪ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রথমে স্কয়ার ফার্মার শেয়ার ডিম্যাট আকারে রূপান্তর করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট, করপোরেট বন্ড ডিম্যাট আকারে রূপান্তরিত হয়।