মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের টানাপোড়েন আজ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং নগরজীবনের চাপ যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে তখন সময় ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া আর বিলাসিতা নয় এটি সময়ের দাবি। এই সংকট কেবল চ্যালেঞ্জই নয়; সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে এটিকে টেকসই অর্থনীতির পথে অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগে পরিণত করা সম্ভব।
বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা যখন জ্বালানি বাজারকে ক্রমাগত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে তখন তার সরাসরি অভিঘাত পড়ছে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর ওপর। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত সেই অস্থিরতাকে আরও তীব্র করেছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই সংকটের বাইরে থাকতে পারেনি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্প খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর একটি বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এই বাস্তবতায় সরকার কর্তৃক অফিস সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা নির্ধারণ, ব্যাংক লেনদেন সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সীমিত করা এবং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এটি মূলত জ্বালানি সাশ্রয়কে প্রাধান্য দিয়ে নেওয়া একটি জরুরি ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ। তবে প্রশ্ন হলো এই ধরনের স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ কি দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনতে পারবে?
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, পরিকল্পনার অভাব এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনা অর্থনীতির ভিতকে দুর্বল করে তুলেছে। জ্বালানি খাতে অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির ফলে আজকের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয় বরং একটি সুপরিকল্পিত, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
প্রথমত: সময় ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। আমাদের দেশে অফিস সময় দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গ্রীষ্মকাল (মে–অক্টোবর) এবং শীতকাল (নভেম্বর–এপ্রিল) অনুযায়ী আলাদা সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে প্রাকৃতিক আলোকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব হবে। গ্রীষ্মকালে সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত এবং শীতকালে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অফিস পরিচালনা করলে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং কর্মজীবী মানুষের পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে। বর্তমানে সকাল ৯টায় অফিস শুরু হওয়ার কারণে তার আগের সময়টি প্রায়ই অপ্রয়োজনীয়ভাবে অপচয় হয় যা অর্থনৈতিকভাবে অদৃশ্য হলেও বাস্তবে একটি বড় ক্ষতি।
দ্বিতীয়ত: নগর অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সময়সূচিতে যুক্তিসঙ্গত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। দোকানপাট ও শপিংমল দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত। এতে দিনের অতিরিক্ত গরম সময় এড়িয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে এবং সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত: শিক্ষা খাতের সময় ব্যবস্থাপনা পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে যা একদিকে যানজট বাড়াচ্ছে অন্যদিকে জ্বালানি অপচয় করছে। এই অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। প্রয়োজনে সরকারি অফিসের পরিবহন ব্যবস্থাকে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
চতুর্থত: নগর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ছাড়া জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব নয়। বর্তমানে মোটরসাইকেলভিত্তিক রাইড শেয়ারিং, অবৈধ অটোরিকশা এবং অপরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি করছে। যানজট মানেই জ্বালানির অপচয়, সময়ের অপচয় এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষতি। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা মেট্রোরেল একটি যুগান্তকারী সম্ভাবনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এর পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে রুট সম্প্রসারণ, কোচ সংখ্যা বৃদ্ধি, ট্রেনের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো এবং শহরের অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। মেট্রোরেলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
পঞ্চমত: বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এখন আর বিকল্প নয় বরং এটি অপরিহার্য। ইলেকট্রিক যানবাহন চালু করা, চার্জিং স্টেশন স্থাপন, সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে, সরকারি ও বেসরকারি ভবনে শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি (energy-efficient systems) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ‘বুয়েট রুফটপ সোলার প্রজেক্ট’-এর আওতায় ১৯টি ভবনের ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পূরণে সক্ষম হবে। এই প্রকল্প ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয় এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সাশ্রয় এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ উদ্যোগ প্রমাণ করে সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি আবাসিক খাতেও সৌরশক্তির বিস্তার ঘটিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব।
ষষ্ঠত: জ্বালানি সাশ্রয়কে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করা প্রয়োজন। সচেতনতা বৃদ্ধি, অপচয় রোধ এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে নাগরিকদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অভীষ্ট তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা, অপ্রয়োজনীয় আলো ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখা এবং পরিবহন ব্যবহারে সচেতনতা এসব ছোট ছোট পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান জ্বালানি সংকট বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। এটি শুধু একটি সংকট নয় বরং একটি সতর্কবার্তা যা আমাদেরকে আরও পরিকল্পিত, দক্ষ এবং টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ শুধু সংকট মোকাবিলা করেই থেমে থাকবে না বরং একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভরশীল ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।