মামলাজনিত কারণে জনবল নিয়োগপ্রক্রিয়া ঝুলে যাওয়া ও আইন অনুযায়ী প্রণীত বিধিমালার অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংকটের মুখে পড়েছে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোরর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। এফআরসি গঠিত হওয়ার এক দশকের বেশি সময় পার হলেও এখনো স্থায়ী জনবল নিয়োগ হয়নি। ২০১৬ সালের এপ্রিলে যাত্রা শুরু হয় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিরীক্ষকদের নিয়ন্ত্রণকারী এ প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু এখনো প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো স্থায়ী জনবল নিয়োগ হয়নি। ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী ইন্টার্ন হিসেবে এফআরসিতে কাজ করছে। বছরের পর বছর ইন্টার্ন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নানাভাবেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অপরদিকে এফআরসির কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় ৪টি বিধিমালা প্রণয়ন করে তা অনুমোদনে অর্থমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অর্থ বিভাগে পাঠানো হলেও সেগুলো প্রায় এক বছর ধরেই ঝুলে রয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ প্রশাসনিক জরিমানা বিধিমালা, আর্থিক বিবরণী দাখিল সংক্রান্ত বিধিমালা, হিসাবরক্ষণ ও আপিল কর্তৃপক্ষ বিধিমালা এবং চার্টার্ড অব লিগ্যাল ফিস বিধিমালা। এসব বিধিমালা অনুমোদন না হওয়ায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না এফআরসি।
এফআরসির চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে গত সোমবার নিয়োগ পেয়েছেন। গতকাল তিনি পদত্যাগও করেছেন। ফলে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়েও সংস্থাটির কার্যক্রমে নতুন করে ধীরতা তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দ্রুত এফআরসির চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিধিমালাগুলোর অনুমোদনের বিষয়ে অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব সৈয়দ রাশেদুল হোসেন দৈনিক আমার দেশ-কে জানান যে, প্রশাসনিক জরিমানা বিধিমালার কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং এটি এখন ভ্যাটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি, আর্থিক বিবরণী দাখিল সংক্রান্ত বিধিমালা, আপিল কর্তৃপক্ষ বিধিমালা এবং চার্টার্ড অব লিগ্যাল ফিস বিধিমালা সংশোধনের কাজও বর্তমানে চলমান রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের মে মাসে এফআরসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক কর কমিশনার সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পর নতুন করে এফআরসিতে স্থায়ী জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেন তিনি। ১৫০ জন জনবল নিয়োগে অর্থমন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলেও প্রথম দফায় ৫৭ জন নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া যায়। নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জনবল নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এফআরসি এবং ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে আবেদন কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু নিয়োগ বিজ্ঞিপ্তি প্রকাশের পর স্থগিতাদেশ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট দায়েরের ঘটনা ঘটে। স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে আপিল বিভাগ নিয়মিত শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে মামলাটি প্রেরণের নির্দেশ দেন। বর্তমানে নিয়মিত বেঞ্চে মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জনবল নিয়োগে এফআরসির পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রণালয়ে নতুন করে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এতে ৫৭ জনকে বাদ দিয়ে ১৫০ জনবলের বাকি ৯৩ জনবল নিয়োগের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। নতুন জনবল অনুমোদনে এফআরসির যুক্তি, ৫৭ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে। সে ব্যাপারে আদালত যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই পরিপালন করবে এফআরসি। ওই ৫৭টি শূন্য পদ বাদ দিয়ে নতুন করে জনবল নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া গেলে এ সংক্রান্ত সংকটের একটা সমাধান হবে। তবে নতুন এ প্রস্তাবনার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত মেলেনি।
এফআরসির সদ্য বিদায়ি চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া আমার দেশকে বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এফআরসিকে শক্তিশালী করতে হবে। স্থায়ী জনবল ছাড়াই এফআরসি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম। আইনগত জটিলতার কারণে সেটি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনি জটিলতা নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আশা করছি বিষয়টির দ্রুত সমাধান হবে। তিনি আরও বলেন, এফআরসির কার্যক্রমে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ৪টি বিধিমালা প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এগুলোর দ্রুত অনুমোদন হবে বলে আশা করছি। তখন এফআরসি আরো বেশি কার্যকর ও কার্যক্ষম হবে। এদিকে হিসাবরক্ষণ ও আপিল কর্তৃপক্ষ বিধিমালা অনুমোদিত না হওয়ায় আপিল কর্তৃপক্ষ গঠন করতে পারছে না এফআরসি। এ কারণে এফআরসির সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ পক্ষের কোনো ধরনের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ মিলছে না। এরই প্রেক্ষিতে গত ১১ আগস্ট এফআরসি কাউন্সিলের কাছে সংক্ষুব্ধ পক্ষ রিভিউ আবেদন করতে পারবেÑ এ ধরনের একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে এফআরসি। আপিল কর্তৃপক্ষ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন, ২০১৫ অনুযায়ী এফআরসি গঠিত হলেও এর কার্যক্রম পরিচালিত হয় আন্তর্জাতিক আইনে। বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন, অডিট রিপোর্ট পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নীরিক্ষক ও নীরিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজের গুনগত মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব এফআরসির।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আর্থিক প্রতিবেদন সঠিক হলে তার ভিত্তিতে সরকার সঠিক রাজস্ব যেমন পাবে তেমনী বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। পুঁজিবাজারে বিদেশ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন যথার্থ হতে হবে।
খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের যথার্থতা নিশ্চিতে এফআরসিকে শক্তিশালী করার কোন বিকল্প নেই। জটিলতা নিরসন করে দ্রুত জনবল নিয়োগে ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় বিধিমালার অনুমোদন দেওয়া উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল আমিন আমার দেশকে বলেন, এফআরসিকে কার্যকর করতে হলে দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। ইন্টার্ন দিয়ে এ ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর চলতে পারে না। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত চারশো থেকে সাড়ে চারশো প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষার মান নিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উদ্বিগ্ন। কিন্তু রেজিস্টার্ড অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত সাড়ে তিন লাখের মতো প্রতিষ্ঠানের নীরিক্ষার বিষয়টি যে প্রতিষ্ঠানের (এফআরসি) অধিক্ষেত্র সেটিকে শক্তিশালী করার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। এফআরসিতে জনবল নিয়োগে আইনী জটিলতা নিরসনে প্রয়োজনে রিভিউ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। জনবল নিয়োগে আইনী জটিলতা নিরসনে রিভিউ কমিটি করণীয় নির্ধারণে কাজ করবে।