মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে দ্রুত বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশটি পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির ওপর সর্বোচ্চ মূল্যসীমা (প্রাইস ক্যাপ) নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠকে দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং জানান, জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে ভোক্তা ও শিল্প খাতকে সুরক্ষা দিতে সরকার দ্রুত ও কঠোরভাবে এই ব্যবস্থা কার্যকর করবে।
সাধারণত দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমে বা বাড়ে এবং সরকার কর সমন্বয় বা ভর্তুকির মাধ্যমে বাজারকে প্রভাবিত করে। কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতার জেরে ‘৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবার’ একটি সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করতে যাচ্ছে দেশটির সরকার।
দেশের জ্বালানি তেলের সার্বিক অবস্থা
দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
তবে বাস্তবে তেল সংগ্রহে দেশজুড়ে গ্রাহকদের মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কারে তেল ভরতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন গ্রাহকদের অনেকে। চাহিদামতো তেল পাচ্ছে না যাত্রীবাহী ও পণ্যপরিবহনকারী গাড়িগুলোও। তেলের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক পাম্প বন্ধ রাখছেন মালিকেরা। আবার সুযোগ বুঝে অনেকেই অবৈধভাবে তেল মজুত করছে। নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার নানান পদক্ষেপ নিলেও বন্ধ হয়নি নৈরাজ্য।
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। জ্বালানি বিভাগ থেকে আজ জানানো হয়েছে, জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান চলাকালে রাজধানীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
আসাদ গেটের মেসার্স সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন ও মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশন, গাবতলীর মেসার্স শাহানাজ ফিলিং স্টেশন, মেসার্স এসপি ফিলিং স্টেশন ও মেসার্স ডেনসো ফিলিং স্টেশন, তেজগাঁও ক্লিন ফুয়েল স্টেশন, টেকনিক্যাল মোড় (গাবতলী) এলাকার মেসার্স আল-মাহমুদ ফিলিং স্টেশন, কল্যাণপুরের মেসার্স কমফোর্ট ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশন ও মেসার্স মোহনা ফিলিং স্টেশন এবং মহাখালীর ইউরেকা ফিলিং স্টেশনে সকল নিয়ম মেনে তেল সরবরাহ কার্যক্রম চালু রয়েছে।
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার সিটি ফিলিং স্টেশন, আরএস এন্টারপ্রাইজ এবং রয়েল ফিলিং স্টেশন, মহাখালীর তশোফা ফিলিং স্টেশন, কল্যাণপুরের মেসার্স সাহিল ফিলিং স্টেশন, মেসার্স সোহরাব সার্ভিসেস ফিলিং স্টেশন এবং দারুস সালামের মেসার্স খালেক সার্ভিস স্টেশন বর্তমানে ‘ড্রাই’ (তেলশূন্য) অবস্থায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে সিটি ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তেলবাহী গাড়ি পৌঁছালেই দ্রুত সরবরাহ পুনরায় শুরু করা হবে। এ ছাড়া মহাখালী এলাকার সোহাগ ফিলিং স্টেশনে তিন হাজার ৫০০ লিটার অকটেনের মজুদ থাকলেও পরিমাপে কিছু অসংগতি পাওয়া যায়। পরে তা সংশোধন করে পুনরায় তেল বিক্রি শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঈদের আগে দাম বাড়বে কি?
ঈদের আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে কিনা এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ঈদুল ফিতরের আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য সংকটের অজুহাতে ঈদ যাত্রা ব্যাহত করা বা পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিনি আরো জানান, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ সন্তোষজনক ও নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে বাসসহ অন্যান্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে ঈদ যাত্রায় কোনো সমস্যা তৈরি হবে না। যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়েরও সুযোগ নেই।
এদিকে, রবিবার (৮ মার্চ) দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট এড়াতে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট যানের ধরন অনুযায়ী তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
কত লিটার তেল সংগ্রহ করা যাবে?
বিপিসির নির্দেশনায় বলা হয়, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নেওয়া যাবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল নিতে পারবে।
এতে আরো বলা হয়, পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও কনটেইনার ট্রাকের ক্ষেত্রে পরিমাণ হবে ২০০ থেকে ২২০ লিটার। জ্বালানি তেল কেনার সময় রসিদ নিতে হবে এবং পরেরবার কেনার সময় সেই রসিদ দেখাতে হবে।
এর আগে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছিলেন, সোমবার (৯ মার্চ) আরো দুটি জাহাজ আসছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি আগেও বলেছি, গতকালকেও বলেছি, আজকেও বলছি, তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নাই। আমরা রেশনিংটা করেছি এই জন্যই যে যুদ্ধ শেষ হওয়া নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা আছে। সে জন্য আমরা একটা রেশনিং করেছিলাম। কিন্তু মানুষ এই রেশনিংটাকে ভয় পেয়ে স্টক করা শুরু করেছে। আসলে আমাদের তেলের কোনো অভাব নাই।’