হোম > বাণিজ্য > অর্থনীতি

বিশ্বে হালাল পণ্যের বিশাল বাজার, রপ্তানিতে পিছিয়ে মুসলিম দেশগুলো

মেহেদী হাসান

বর্তমানে বিশ্বের মোট ৮৩০ কোটি জনসংখ্যার ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ মুসলমান। সে হিসাবে বিভিন্ন দেশে অন্তত ২১২ কোটি মুসলিম ধর্মাবলম্বী বসবাস করছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা গবেষণা সংস্থার রিয়েল-টাইম ডেটা ট্র্যাকারের হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশ্বে খ্রিষ্টান ধর্মের পর ইসলাম হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল। ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে মুসলিমদের মধ্যে সর্বদা হালাল পণ্যের চাহিদা সর্বাগ্রে। স্ট্যাটিস্টা, গ্রান্ড ভিউ রিসার্চসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা সংস্থার সবশেষ তথ্যানুযায়ী, বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত মোট ভোগ্যপণ্যের বার্ষিক আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এর পরিধি ও বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে হিসাবটি কিছুটা ভিন্ন হলেও বিশ্বে প্রায় ৩ দশমিক ৫৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের হালাল পণ্যের চাহিদা রয়েছে।

টুওয়ার্ডস ফুড অ্যান্ড বেভারেজেসের মতে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক হালাল উপাদানের বাজারের আকার ৯৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৯৬ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যা এবং ক্লিন-লেবেল পণ্য সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতার কারণে বাজারটি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

হালাল বিষয়টি ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি এটি একটি বৈশ্বিক ধারণা এবং খাদ্য থেকে শুরু করে পোশাক পর্যন্ত অনেক কিছুই এ ধারণার মধ্যে আছে। মূলত এটি একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক, যেখানে হালাল পণ্য ও সেবার উৎপাদন, উন্নয়ন, সরবরাহ এবং বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদান একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এ উপাদানগুলো সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে। হালাল ইকোসিস্টেমের প্রতিটি অংশের নিজস্ব কার্যক্রম থাকলেও তারা পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। ফলে একটি টেকসই ও ক্রমবর্ধমান ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অর্থাৎ উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে যাওয়ার প্রতি স্তরে হালাল পদ্ধতি বা উপকরণ ব্যবহার করে গড়ে ওঠে হালাল শিল্প।

উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ও লজিস্টিকসের কারণে বিশ্ববাজারে হালাল পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে অমুসলিম দেশগুলোর আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমির (এসজিআইই) সবশেষ অর্থনৈতিক তথ্যানুযায়ী, হালাল পণ্য (বিশেষ করে খাদ্য, মাংস ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য) উৎপাদন ও রপ্তানিতে ক্রমানুসারে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে—ব্রাজিল, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড এবং তুরস্ক।

অমুসলিম দেশগুলো বিশ্বের মোট হালাল খাদ্যের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে। কারণ, এসব দেশের বিশাল চারণভূমি ও স্বয়ংক্রিয় পশুপালন ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় ও বিশাল উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কসাইখানা এবং কড়া আন্তর্জাতিক হালাল সার্টিফিকেশন ও হাইজিন মানদণ্ড বজায় রাখার আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে।

বিশ্বে প্রচলিত হালাল পণ্যগুলোর মধ্যে গরু ও মুরগির মাংসের বৃহত্তম রপ্তানিকারক ব্রাজিল, যার মূল বাজার মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসিভুক্ত দেশগুলো। এছাড়া চীন থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কৃষিপণ্য, হালাল কসমেটিকস ও লাইফস্টাইল পণ্য; ভারত থেকে মহিষের হিমায়িত মাংস, বাসমতি চাল ও প্রক্রিয়াজাত শস্যদানা; যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোলট্রি ও গরুর মাংস, শস্য ও উচ্চমানের দুগ্ধজাত পণ্য; রাশিয়া থেকে গম, শস্যদানা ও মুরগির মাংস; ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পামঅয়েল, হালাল কসমেটিকস ও ওয়ানটাইম কনজ্যুমার পণ্য; মালয়েশিয়া থেকে পাম তেলভিত্তিক খাদ্য উপাদান, কেমিক্যাল, কসমেটিকস ও ওষুধ; অস্ট্রেলিয়া থেকে ভেড়া ও গরুর মাংস; থাইল্যান্ড থেকে সি-ফুড, হালাল প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার এবং তুরস্ক থেকে দুগ্ধজাত ও বেকারি পণ্য, কনফেকশনারি, ফ্যাশন ও লাইফস্টাইলসামগ্রী মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিমপ্রধান দেশগুলোয় রপ্তানি করা হয়। এর মধ্যে থাইল্যান্ড অমুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ‘বিশ্বের হালাল রান্নাঘর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে।

তবে মালয়েশিয়াকে হালাল শিল্পের বৈশ্বিক রোলমডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটিতে হালাল শিল্প নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। জাবাতান কেমাজুয়ান ইসলাম মালয়েশিয়ার (জাকিম) হালাল সার্টিফিকেট বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রভাবশালী মানদণ্ড।

এদিকে, ইন্দোনেশিয়াও ৩ দশমিক ৫৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক হালাল বাজারে প্রধান ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি জাকার্তায় হালাল ইন্দো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভোক্তা প্রদর্শনীর উদ্বোধনের পর স্থানীয় গণমাধ্যমে দেশটির শিল্প উপমন্ত্রী ফয়সোল রিজা বলেন, ইন্দোনেশিয়ার ক্রমবর্ধমান শিল্প ভিত্তি এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ মুসলিম ভোক্তা বাজারের কারণে বৈশ্বিক হালাল বাজারের সুযোগগুলো কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দেশটির একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে।

বাংলাদেশও হালাল শিল্পের উন্নয়ন এবং খাতটির বৈশ্বিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চায়। এজন্য দেশটি মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এবং এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফরেও ‘হালাল শিল্প’ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ৩ দশমিক ৫৬ ট্রিলিয়ন ডলারের এই বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও একক সনদের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় দেশেই অভ্যন্তরীণভাবেই পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। তবে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের হালাল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ এখন মাত্র ৮৫ কোটি ডলারের কাছাকাছি, যার সিংহভাগই কৃষিভিত্তিক পণ্য। যথাযথ পদক্ষেপ নিলে মালয়েশিয়ার বিশাল বাজারেই বাংলাদেশ কয়েক বিলিয়ন ডলারের খাদ্য রপ্তানি করতে পারে বলে মনে করছে দেশের ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো।

এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত বুধবার ইন্দোনেশিয়ায় শুরু হওয়া ‘ডি-৮ হালাল এক্সপো ২০২৬’-এ বাংলাদেশ থেকে ২২টি প্রতিষ্ঠান ও প্রায় ৪০ সদস্যের একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া ও ডি-৮ভুক্ত অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের আগ্রহের প্রতিফলন ঘটেছে। ঢাকার ইন্দোনেশীয় দূতাবাস এবং ইন্দোনেশিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (আইবিসিসিআই) যৌথভাবে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের এ এক্সপোতে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করে। এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে হালাল শিল্প, খাদ্য ও পানীয়, ফ্যাশন, উৎপাদন ও ভোক্তাপণ্য খাতে আঞ্চলিক ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণে বাংলাদেশের আগ্রহ তুলে ধরা হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্বে আয়োজিত অন্যতম প্রধান কর্মসূচি হিসেবে ডি-৮ হালাল এক্সপো ২০২৬ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার পর্দা নামবে আগামীকাল রোববার। এর লক্ষ্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে হালাল শিল্পের প্রসার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো জোরদার করা।

তবে বর্তমানে বাংলাদেশের খাতটিতে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন জটিলতা। বাংলাদেশে ২০২১ সাল থেকে বিএসটিআই এবং ২০২৩ সালের নতুন নীতিমালার পর ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই দুটি পৃথক সংস্থা হালাল সনদ দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব কোনো পরীক্ষাগার বা ল্যাব নেই, আবার বিএসটিআইয়ের পরীক্ষার সক্ষমতাও সীমিত।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হালাল খাতে বৈশ্বিক সুফল পেতে হলে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট ‘হালাল অর্থনৈতিক জোন’ প্রতিষ্ঠা করা গেলে এই সংকটের কার্যকর সমাধান সম্ভব। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) মালয়েশিয়ার এইচডিসির সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মানের সনদ নিশ্চিত করা গেলে হালাল শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অন্যতম ‘গেমচেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।

দেশে হালাল পণ্য বিপণনের প্রবক্তা সৈয়দ আলমগীর বলেন, হালাল শব্দটি আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আমিই প্রথম সেটার বাণিজ্যিক ব্যবহার করি হালাল সাবানের মাধ্যমে। ওই সময় পণ্যের সঙ্গে হালাল শব্দ কোনো দেশেই ব্যবহার হয়নি। এখন সব পণ্যে, ফুডে, আর্থিক ব্যবস্থায়, পোশাক, পর্যটনসহ বিভিন্ন বিষয়ে হালাল ছড়িয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি মালয়েশিয়াতে এটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

হালাল পণ্যে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, হারাম উপাদান নেই—এমন নিশ্চয়তা খুব শক্তভাবে দিতে হবে। যেমন, আমি আমার সাবানের ব্যাপারে বলেছিলাম, এখানে ভেজিটেবল ফ্যাট ছাড়া গরু বা অন্য কোনো পশুর চর্বি নেই। কিন্তু বাজারের অন্য সব সাবান হারাম, কারণ এখানে গরু বা শূকরের চর্বি দেওয়া আছে।

তিনি আরো বলেন, একটা মানুষের শুধু খাবারে হালাল হলেই চলবে না, কর্মপদ্ধতিতেও হালাল হতে হবে। যেমন- সুদ, ঘুষ, প্রতারণা ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকতে হবে। এ জন্যই আমি সাবানে হালাল দিতে গেছি, যাতে হালাল মতে চলতে পারি। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হালাল পণ্য বাজারে বের করেছে, কিন্তু তাদের হালাল পণ্য সম্পর্কে আপনি জানেন না।

আবার বাড়ল স্বর্ণের দাম

সিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারী বসুন্ধরার আইনি দিক পর্যালোচনা হচ্ছে

আবারও দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম

মূল্যস্ফীতি টানা তিন মাস ৯ শতাংশের বেশি

দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

দেশের বাজারে আবারো বাড়ল স্বর্ণের দাম

রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় ফের পেছাল

শুক্রবার বেলা ৫টা পর্যন্ত ই-ভ্যাট সেবা বন্ধ থাকবে

আমদানিতে সুদের ঝুঁকি মোকাবিলায় ফরওয়ার্ড রেট চুক্তির অনুমোদন