সরকারি-বেসরকারি অনেক ব্যাংকে রেকর্ড পরিমাণ তারল্য অলস পড়ে আছে। বেসরকারি খাত থেকে ভালো ঋণ প্রস্তাব পাচ্ছে না। শিল্প বিনিয়োগের নতুন ঋণ কিংবা প্রকল্প সম্প্রসারণের প্রস্তাবনাও পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। আবার যেনতেন ঋণ প্রস্তাবে সায় দিচ্ছে না অধিকাংশ পরিচালনা বোর্ড। ফলে অতিরিক্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো তুলনামূলক সংকটে থাকা ব্যাংকে এফডিআর ও কলমানিতে টাকা খাটাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিল বন্ডে বিনিয়োগ করেও উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন আমানত নিরুৎসাহিত করছে। মেয়াদি আমানতের সুদের হার মাত্রাতিরিক্ত কমিয়ে দিয়েছে। দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে।
কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা সমস্যায় স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের বেসরকারি খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য। ফলে নতুন বিনিয়োগ আগ্রহ নেই উদ্যোক্তাদের। এতে করে ব্যাংকগুলোয় নতুন ঋণের প্রস্তাব কমে গেছে। মোটের ওপর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। গত সেপ্টেম্বরে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪.১৭ শতাংশে। সাত মাস ধরে এ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছু ব্যাংক সংকটে থাকলেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট নেই। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। তবে পুরোনো ব্যবসায়ীদের অনেকেই নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ঋণ ও দায় সমন্বয়ের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
ব্যাংকাররা জানান, যেসব ব্যাংকের তারল্য ভালো অবস্থানে রয়েছে, সেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও নতুন করে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তা কিংবা ছোট ব্যবসা থেকে বড় হওয়ার মতো নতুন গ্রাহক তৈরি হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো মূলত পুরোনো ও নির্ভরযোগ্য করপোরেট গ্রাহকদের ওপর নির্ভর করছে। ফলে নতুন ঋণের চাহিদা কমে গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য স্থিতি ছিল প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বাজারে নতুন উদ্যোক্তা বা ছোট ব্যবসা থেকে বড় হওয়ার মতো নতুন গ্রাহক তৈরি হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো মূলত পুরোনো ও নির্ভরযোগ্য করপোরেট গ্রাহকদের ওপর নির্ভর করছে। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি না হওয়ায় ব্যাংকগুলোয় ঋণের প্রস্তাব আসছে না বললেই চলে।
ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক সম্মেলনে একই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের বেশি দেখানো হলেও প্রকৃত নতুন ঋণপ্রবাহ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। ব্যাংক ঋণের সঙ্গে অনাদায়ী সুদ যুক্ত হওয়া এবং বাধ্যতামূলকভাবে সৃষ্ট ঋণ বাদ দিলে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির চিত্র আরো দুর্বল হতে পারে।
মাসরুর আরেফিন বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির কতটা প্রকৃত নতুন ঋণ বিতরণের প্রতিফলন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ব্যাংকগুলোর হিসাবে অনাদায়ী সুদ যুক্ত হওয়া এবং আগে দেওয়া ঋণের দায় মেটাতে নতুন ঋণ সৃষ্টি হওয়ার মতো বিষয়গুলো বাদ দিলে নিট ঋণ প্রবৃদ্ধি কতটা থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিনিয়োগে স্থবিরতার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোয় বড় অঙ্কের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলার চাহিদা দেখা যাচ্ছে না। নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা বিদ্যমান কারখানা সম্প্রসারণের জন্যও ব্যবসায়ীরা উল্লেখযোগ্য ঋণ নিচ্ছেন না। এমনকি ব্যাংক থেকে ঋণসীমা অনুমোদন পাওয়ার পরও অনেক ব্যবসায়ী তা ব্যবহার করছেন না। তার মতে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। ফলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে উদ্যোক্তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এদিকে স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে সেখানেও ঋণ বিতরণের গতি নেই। পুরো তহবিল থেকে ছাড় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রভাব ব্যাংকগুলোয় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আগের তুলনায় নতুন ঋণ প্রস্তাব বা আবেদনের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। ঋণের গতি ফেরাতে বিভিন্ন নতুন স্কিম চালু করা হলেও সেগুলোর ইতিবাচক প্রভাব আসতে কিছুটা সময় লাগবে। আবার কিছু স্কিমের বিষয়ে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। তবে নতুন ঋণ প্রস্তাব কমে গেলেও গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা ও অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এনআরবি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) কিমিয়া সাদাত বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা কারণে বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। সবাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাই চলতি বছরে ঋণ প্রবৃদ্ধি খুব একটা বাড়ার সম্ভাবনা নেই। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী বছরে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে গতি ফিরবে।
তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৭২ শতাংশ। এপ্রিলেও প্রবৃদ্ধি একই পর্যায়ে ছিল। মে মাসে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪.৯৮ শতাংশ হয়। এরপর জুন ও জুলাইয়ে আবার কমে যায়। আগস্টে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৭৫ শতাংশ। আর গত সেপ্টেম্বরে কমে হয় ৪.১৭ শতাংশ। ফলে সাত মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচেই রয়েছে ।
আইএফআইসি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও প্রধান ঋণ কর্মকর্তা শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদ বলেন, উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমেছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চ চাপে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিকেই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।