হোম > বাণিজ্য > অর্থনীতি

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের উৎপাদন কমেছে, লক্ষ্যমাত্রা অধরা

কাওসার আলম

উৎপাদন কমার পাশাপাশি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) আওতাধীন ৯ চিনিকলের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫১ হাজার ৮৫৭ টন। কিন্তু মাড়াই শেষে চিনিকলগুলোর উৎপাদিত চিনির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৬ টনে। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদন কম হয়েছে আট হাজার ৫৩১ টন। উৎপাদন কমার এ হার ১৬ শতাংশের বেশি।

অপরদিকে গত মৌসুমের তুলনায় চিনি উৎপাদনের পরিমাণ কমেছে। আগের বছরের তুলনায় উৎপাদন কম হয়েছে দুই হাজার ৮৬১ টন। বিগত মৌসুমে উৎপাদিত চিনির পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ১৮৭ টন।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ঠাকুরগাঁও ও জিলবাংলা সুগার মিলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি চিনি উৎপাদন হয়েছে। ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে পাঁচ হাজার ৬৭০ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পাঁচ হাজার ৮৩৬ টন এবং জিলবাংলা সুগার মিলে পাঁচ হাজার ৩৬৮ টন চিনি উৎপাদন হয়েছে। এ চিনিকলের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল চার হাজার ৯০০ টন। সবচেয়ে বেশি চিনি উৎপাদন হয়েছে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে। এই মিলে চিনি উৎপাদনের পরিমাণ ৯ হাজার ৬৫৪ টন। আর দুই হাজার ৮০১ টন উৎপাদনের মাধ্যমে সবচেয়ে কম উৎপাদনের তালিকায় রয়েছে জয়পুরহাট সুগার মিল।

তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের মাধ্যমে চলতি মৌসুমের মাড়াইকাজ শুরু হয় এবং ২৬ ডিসেম্বর সবশেষ মাড়াইকাজ শুরু হয় জয়পুরহাট সুগার মিলের। চলতি বছরের ৫ মার্চ জিলবাংলা সুগার মিলের মাড়াইকাজ সম্পন্নের মাধ্যমে শেষ হয় চলতি (২০২৫-২৬) মৌসুমের মাড়াইকাজ। সুগার মিলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০৮ দিন মাড়াই হয়েছে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে। আর সবচেয়ে কম মাড়াই হয়েছে জয়পুরহাট ও রাজশাহী সুগার মিলে। এ দুটি মিলে মাড়াই হয়েছে ৪৫ দিন করে । চলতি মাড়াই মৌসুমে ৯টি সুগার মিলে মোট মাড়াই হয়েছে ৬৪৩ দিন। আগের মৌসুমে এ সংখ্যা ছিল ৬৬৩ দিন। এ হিসাবে আগের মৌসুমের তুলনায় মাড়াই কম হয়েছে ২০ দিন।

চলতি মাড়াই মৌসুমে মোট আট লাখ ৫০ হাজার টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও মাড়াই হয়েছে সাত লাখ ৮২ হাজার ৬৭৩ টন। এ হিসাবে মাড়াই কম হয়েছে ৬৭ হাজার ৩২৭ টন। এর ফলে চিনি উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। তবে আগের মাড়াই মৌসুমের তুলনায় আখ আহরণের হার সামান্য বেড়েছে। চলতি মৌসুমে চিনি আহরণের হার ছিল পাঁচ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আগের মৌসুমে এ হার ছিল পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশ। তবে চিনি আহরণের হার কিছুটা বাড়লেও এটা সন্তোষজনক নয় বলেই সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, আখ থেকে চিনি আহরণের হার কমে যাওয়ায় চিনিকলগুলোর উৎপাদনশীলতা যেমন কমেছে, একইসঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। উৎপাদনের এই হার আট শতাংশ বা তার বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু উন্নত আখের জাত উদ্ভাবন না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত হারের কাছাকাছিও যেতে পারছে না চিনিকলগুলো। ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করলেও সেগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত হারে চিনি পাওয়া যাচ্ছে না।

কাঙ্ক্ষিত হারে চিনি উৎপাদন না হওয়ার জন্য শুধু জাত সংকটই দায়ীÑএমনটিও নয়। চাষ থেকে শুরু করে মাড়াই পর্যন্ত যেসব পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন, তা পরিপালন করা হয় না এবং আধুনিক পদ্ধতির পরিবর্তে এখনো অনেক ক্ষেত্রে সনাতনী পদ্ধতি বহাল রয়েছে। উৎপাদিত আখের গুণগত মান সঠিক না হওয়ায় চিনি আহরণের হার সন্তোষজনক নয়।

তবে চিনি আহরণের হার কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে চিনিকলগুলোর রুগ্ণ দশা। চিনিকলগুলোর অধিকাংশই অনেক পুরোনো। অধিকাংশ কলের আয়ুকাল ইতোমধ্যে ফুরিয়ে গেছে। তারপরও মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিএমআরএর মাধ্যমে এগুলো চালু রাখা হয়েছে। আধুনিকায়নের মাধ্যমে চিনিকলগুলো চালু করা গেলে চিনি আহরণের হার বাড়বে। এতে কলগুলোর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি মৌসুমে যে ৯টি চিনিকিলে আখ মাড়াই হয়েছে, তার কোনোটিরই চিনি আহরণের হার সাত শতাংশও ছিল না। আহরণের দিকে সবচেয়ে শীর্ষে থাকা জিলবাংলার হার ছিল ছয় দশমিক ৩৮ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঠাকুরগাঁও চিনিকল। এ কলের আহরণের হার ছয় দশমিক এক শতাংশ। পাঁচটি চিনিকলের আহরণের হার পাঁচ শতাংশের বেশি হলেও দুটি চিনিকলের হার ছিল পাঁচ শতাংশের কম। এর মধ্যে সবচেয়ে কম আহরিত হয়েছে মোবারকগঞ্জ চিনিকল থেকে। এ কলের চিনি আহরণের হার ছিল চার দশমিক তিন শতাংশ। জয়পুরহাট চিনিকলের এ হার ছিল চার দশমিক ৯৩ শতাংশ।

জানতে চাইলে বিএসএফআইসি সচিব মুজিবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, চিনিকলগুলোর অধিকাংশই পুরোনো। একসময় সাড়ে সাত থেকে আট শতাংশের বেশি হারে চিনি আহরণ করা হতো। ধীরে ধীরে সে হার কমছে; অর্থাৎ কলগুলোর দক্ষতার পরিমাণ কমে আসছে। এগুলোর আধুনিকায়ন করা হলে চিনি আহরণের হার বাড়ত।

এ প্রসঙ্গে তিনি কেরু সুগার মিলের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, মিল হাউস (আখ থেকে রস আহরণে ব্যবহৃত মেশিনারিজ) ও বয়লার পরিবর্তন করার কারণে আগের তুলনায় এ মিলটির চিনি আহরণের হার ০.৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্যান্য মিলেও যদি এ ধরনের পরিবর্তন করা যায়, তাহলে চিনি আহরণের হার আরো বাড়ত।

তবে চিনি আহরণ কম হওয়ার বিষয়ে জাত সংকটকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করে মুজিবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা আখের ভালো জাত সংকটে রয়েছি। এখন যেসব জাতের চাষাবাদ করা হয়, সেগুলো অনেক পুরোনো জাতের। ফলে এসব জাত থেকে স্বাভাবিকভাবেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চিনি আহরণ সম্ভব হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৫ চিনিকলের মধ্যে ১০টিরই আয়ুকাল ফুরিয়ে গেছে। বর্তমানে ৯টি চিনিকলের উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০২১-২২ মাড়াই মৌসুমে হঠাৎ করেই ছয়টি চিনিকল বন্ধ করে দেয়। এগুলো হলো : পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, রংপুর, শ্যামপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়া চিনিকল।

চিনিকলগুলোর আধুনিকায়নের নামে চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য চুক্তিও করে সরকার। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে সে চুক্তি বাতিল করা হয়। তখন বন্ধ ঘোষিত ছয় চিনিকল চালুর ঘোষণা দেন তৎকালীন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে মিলগুলোর মাড়াই কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

চিনিকলগুলোর উৎপাদন চালুর লক্ষ্যে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়। টাস্কফোর্স চালুর ব্যাপারে সুপারিশ করলেও অর্থ মন্ত্রণালয় কোনো অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ায় সেগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধই রয়ে গেছে। এর ফলে চিনিকলগুলোর যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগ জোরদারে বৈঠক

রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ৯৭ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা

বিশ্ববাজারে কমেছে স্বর্ণের দাম, এখন দেশে ভরি কত

দেড় মাস পর ফের রিজার্ভ ছাড়াল ৩৫ বিলিয়ন ডলার

ভ্যাট-নির্ভর রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা, লক্ষ্য ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি

১৪ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৬০৭ মিলিয়ন ডলার

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দেখা দিতে পারে বিশ্বমন্দা, আইএমএফের সতর্কবার্তা

তেলের দাম বাড়ার ইঙ্গিত দিলেন মার্কিন জ্বালানিসচিব

এপ্রিলের ১২ দিনে এলো সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স

মানি মার্কেটে লেনদেনভিত্তিক রেফারেন্স রেট চালু করলো বাংলাদেশ ব্যাংক