দীর্ঘদিন ধরে গুটি কয়েক পণ্যে আটকে আছে রপ্তানি বাজার। পণ্য রপ্তানিতে আসেনি বৈচিত্র্য। পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতায় ঝুঁকিতে রপ্তানি খাত। ৮০-৮৫ শতাংশ রপ্তানি আয় হয় তৈরি পোশাক খাত থেকে। বাকি পাঁচ থেকে ছয়টি পণ্য থেকে আসে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রপ্তানি আয়। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বেসরকারি খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আয়োজিত দ্বিতীয় মতবিনিময় সভায় দেশের সম্ভাবনাময় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তা থেকে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান বা কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুতের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মতবিনিময় সভার কার্যপত্র থেকে জানা যায়, সভায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন প্রথম সভার বিভিন্ন অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে অধিকতর সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
সভায় অর্থমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টাসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, রপ্তানি নীতি ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে পণ্য রপ্তানি বছর বছর আরো কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এমন সময়ে সরকার রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে যেসব উদ্যোগের কথা বলছে সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই, উৎপাদনমুখী ও ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলতে এই কর্মপরিকল্পনা ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ইতোমধ্যে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইবিপি) মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে একটি বৈঠক করেছে। শিগগির এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হবে।
জানা গেছে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানির ঝুড়ি সমৃদ্ধ করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের যেসব খাতের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে—বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চামড়াজাত পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হবে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরো শক্তিশালী হবে বলে প্রত্যাশা সরকারের।
সভায় বলা হয়েছে, শুধু জাতীয় পর্যায় নয়, বরং দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়িয়ে জেলাভিত্তিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলার স্থানীয় পণ্য উৎপাদন, বিদ্যমান সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ রপ্তানির সম্ভাবনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরূপণ করার জন্য একটি বিশেষ গবেষণার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি অঞ্চলের ক্লাস্টারভিত্তিক পণ্যের বিকাশ ঘটানো সহজ হবে।
এছাড়া গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে বিশ্ববাজারে পরিচিত করতে ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট (এক গ্রাম এক পণ্য) কনসেপ্টটি আরো জোরালোভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হয়ে সরাসরি রপ্তানির সুযোগ লাভ করবে, যা গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনেও বড় ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, যেকোনো নীতি সহায়তাই রপ্তানি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক দিন ধরেই এমন দাবি আমরা করে আসছি। আর ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট শক্তিশালী করতে পারলে রপ্তানির বাজার এবং পণ্যে বৈচিত্র্য আসবে।