হোম > বাণিজ্য > বাজার বিশ্লেষণ

রমজানের শুরুতেই সারা দেশে অস্থির বাজার, ক্রেতাদের নাভিশ্বাস

আমার দেশ ডেস্ক

রমজানের শুরুতেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে বাজার। প্রতিটি পণ্যেই চড়াদামে বিক্রি হচ্ছে। এতে করে নিম্নআয়ের মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। চড়াদামে পণ্য ক্রয় করে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ক্রেতারা। নাভিশ্বাস উঠেছে রোজাদারদের।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম। রমজান মাস ঘিরে দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। শহরের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পৌর শহরের পেঁয়াজ, রসুন, শসা, লেবু ও গাজরসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। শসা এবং গাজরের দাম প্রতি কেজি দ্বিগুণ বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি শসা ৪০ টাকায় এবং গাজর প্রতি কেজি ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি শসা ৮০ টাকা এবং গাজর ৮০-৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

দেশি পেঁয়াজের কেজিতে ১২-১৩ টাকা বেড়ে প্রকারভেদে ৫৫-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রসুন কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি দেশি রসুন ১৩০ টাকা ও চায়না রসুন কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে মানভেদে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন সমস্যা, চাহিদা বৃদ্ধি এবং আমদানি কম থাকায় পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচামরিচসহ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। বাজার করতে আসা সিরাজ বললেন, দুই কেজি শসা ৮০ টাকা কেজি দরে ১৬০ টাকায়, ধনেপাতা প্রতি কেজি ৪০ টাকা, গাজর ৬০ টাকা কেজি দরে কিনেছি। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে এর চেয়ে অর্ধেক দামে কিনেছি। হঠাৎ করে দাম দ্বিগুণ হয়েছে। রমজান মাস এলেই দাম বাড়ে। এ বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে।

এদিকে শহরে বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে প্রতি কেজি টমেটো প্রকারভেদে ৩০-৪০, ফুলকপি ৪০-৫০, বাঁধাকপি ৩০, বেগুন ৫০-৬০, শিম ৩০-৪০, শিমের বিচি ৯০ থেকে ১০০ টাকা, করলা ৬০-১০০ ও কাঁচা মরিচ ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মাছের বাজারে প্রতি কেজি রুই মাছ ৩০০ থেকে ৩৫০, পাবদা ৪০০ থেকে ৬০০, পাঙাশ ২০০, তেলাপিয়া ১৮০-২০০ টাকা, দেশি শিং ৫০০-৭০০ টাকা, টেংরা প্রকারভেদে ৪০০-৭০০, তেড়া বাইম ৪০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে প্রতি কেজি হাড়সহ গরুর মাংস ৭৫০ টাকা ও হাড় ছাড়া গরুর মাংস ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০, সোনালি মুরগি ৩০০ ও দেশি মুরগি ৬০০-৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি ডজন ফার্মের লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায়। হাঁসের ডিম প্রতি হালি প্রকারভেদে ৬৫-৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে মুদি দোকানে প্রতি কেজি ছানা ৮০-৯০ টাকা, মসুর ডাল (মোটা) ৯০, খেসারি ডাল ১০০, মুগ ডাল (বড়) ১২০ ও মুগ ডাল (ছোট) ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি কেজি খোলা চিনি ১০৫ টাকা, প্যাকেট আটা (দুই কেজি) ১১০ ও প্যাকেট ময়দা (দুই কেজি) ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পাইকারি সবজি বিক্রেতা প্রসেনজিৎ দে বলেন, পরিবহন সমস্যা, চাহিদা বেশি এবং আমদানি কম থাকায় কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ ও রসুনের দাম বেড়েছে। সামনের দিনগুলোতে আরো কমবে। পণ্যের দাম আর বাড়বে না আশা করছি। কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সুমন মিয়া বলেন, রমজান মাসে প্রত্যেকেই বেশি করে বাজার করছেন। চাহিদার তুলনায় আমদানি কম থাকায় দামটা বেড়েছে। তিন-চারদিনের মধ্যে পেঁয়াজ, রসুনসহ নিত্যপণ্যের দাম কমে আসবে।

জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম মাসুদ বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুসারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। রমজানকে সামনে রেখে প্রতিদিনই তদারকি করা হবে। কেউ যদি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যসামগ্রী বেশি দামে বিক্রি করতে চায় ও প্রমাণিত হয় তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধি জানান, নওগাঁ সাপাহারে রমজানের প্রথম দিনেই ইফতার সামগ্রীসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। ছোলা, ডাল, বেগুন, লেবু, বেসন, খেজুর, মুরগি ও গরুর মাংস—প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বৃহস্পতিবার সাপাহার উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক সপ্তাহ আগে ৮০ টাকা কেজির ছোলা এখন বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। কাঁচা মরিচ কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। ৬০ টাকার বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। শসা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, আর লেবু হালিতে ৩০ টাকা বেড়ে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খেজুর প্রকারভেদে ৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে, বেসন ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, আর বোতলজাত সয়াবিন তেল অনেক দোকানেই পর্যাপ্ত পাওয়া যাচ্ছে না।

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, পবিত্র মাহে রমজানে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা সর্বত্রে অসাধু ব্যবসায়ীরা খাবারের বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। দুধের লিটারপ্রতি দ্বিগুণ মূল্য বৃদ্ধি করায় আলোচনার সৃষ্টি হয়। পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, দেশি মুরগি ব্রয়লার, ফলসহ নানা জাতীয় খাবারের পণ্য এখানে সাত দিন আগের মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। রমজান শুরুর তিন দিন আগে এখানকার হাটবাজারে প্রতি লিটার দুধ ৫০ থেকে ৬০ টাকায় প্রতি লিটার বিক্রি হলেও রমজান শুরুর আগের দিন থেকে এখানকার হাটবাজারে প্রতি লিটার দুধ বিক্রি করা হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। এ ব্যাপারে ফুলবাড়ী ইউএনও দিলারা আকতার জানান, রমজানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করছেন। তিনি এ সময় বাজার বণিক সমিতির প্রতিনিধিসহ সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, রমজানের শুরুতেই পাবনার চাটমোহরে অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার। অনেক পণ্য চলে গেছে মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। বেগুনে আগুন লেগেছে আর লেবুতে চোখে পানি আসছে ক্রেতাদের।

রমজানে ইফতারিতে অন্যতম উপাদান বেগুনি। বেগুনের কেজি ৯০ টাকা। আর একটি বেগুন ৮-১০ ফালি করে বেসন দিয়ে ভেজে বেগুনি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে পাঁচ টাকা করে। শুক্রবার সরেজমিন চাটমোহর পুরাতন বাজার এবং নতুন বাজার গিয়ে দেখা যায়, মুরগি, বেগুন, কাঁচামরিচ, লেবু, আদা, রসুনসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। ইফতারের অন্যতম খাবার খেজুরের দামও অনেক বাড়তি। তবে ছোলা, ডাল, ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম এখনো বাড়েনি।

রমজানে আয় না থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় বাড়তি খরচের চাপ পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। ফলে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

চাটমোহরের দুটি প্রধান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। পাশাপাশি লেয়ার মুরগির ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা, সোনালি (কক) বিক্রি হচ্ছে ২৯০ টাকা কেজি, আর দেশি মুরগি ৪৮০-৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

ওই বাজারের মুরগি বিক্রেতা ফরিদ বলেন, ‘মুরগির সরবরাহ কম। খামার থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে বেশি দামে বিক্রি করছি’।

এদিকে খুচরা সবজি বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক সপ্তাহ আগে বেগুন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি বিক্রি হতো, বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকায়। কাঁচামরিচ কেজিতে ৩০-৪০ টাকা বেড়ে ১৬০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, লেবুর কেজি ১৬০ টাকা, করলা কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা। গোল আলু প্রকারভেদে ১৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি, শসা ৮০ টাকা, টমেটো ৮০ টাকা কেজি, কাঁচা মরিচের ঝাঁজও বেড়েছে প্রকারভেদে কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি, ব্রুকলি ৫০ টাকা প্রতিটি, লাউ প্রতিটি ৫০-৬০ টাকা, কাঁচকলা ২৫ টাকা হালি, সাগরকলা, সবরি কলা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা হালি। তবে অন্যান্য সবজির দাম স্থিতিশীল রয়েছে।

এদিকে পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি রসুন ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়, আদার দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি। পিয়াজু তৈরির পেঁয়াজের দামও বেড়েছে কেজিপ্রতি ৫-৮ টাকা। ইফতারের অন্যতম অনুসঙ্গ সাধারণ মানের খেজুর কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ২৪০-২৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা কেজি দরের খেজুরও মিলছে বাজারে।

বাজার করতে আসা বালুচরের মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রোজার আগে যেসব নিত্যপণ্যের দাম ছিল ১০ টাকা তা এখন দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে। ৬০০ টাকা কেজির চিংড়ি মাছ ১২০০ টাকা, শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি, রুই-কাতলা মাছ প্রকারভেদে ২৫০ থেকে ৪৩০ টাকা কেজি।

এছাড়া নদী ও চলনবিলের আইর, গুজা, বাইন, গুচি, মাগুর বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকা কেজি। গরুর মাংস এবং খাসির মাংসের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে।

চাটমোহর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মোখলেছুর রহমান বিদ্যুৎ জানান, রমজানে বাজার কিছুটা উঠানামা করে। তবে আমরা বিষয়টি মনিটর করছি।

এ ব্যাপারে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুসা নাসের চৌধুরী জানান, ভোক্তা পর্যায়ে কোনো পণ্যের মূল্য বেশি নেওয়া হলে সেসব ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরো জানান, রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার স্বাভাবিক রাখতে আমরা মনিটরিং করছি।

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নতুন সরকারের

রমজানের আগেই বাড়তি নিত্যপণ্যের দাম

ভোজ্যতেল-মুরগির দাম বাড়লেও কমেছে সবজি ও ডিমে

হাত ঘুরলেই দাম বাড়ে পাঁচ কৃষি পণ্যের, ‘লাভের গুড়’ খায় মধ্যস্বত্বভোগীরা

রমজানে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ