রাজধানীতে মশার উপদ্রব আবারও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই বাসা-বাড়ি, সড়ক, পার্ক—সবখানেই বাড়ছে মশার দাপট। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন নগরবাসী। এ পরিস্থিতিতে ১২টি ওয়ার্ডকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে চার স্তরের তদারকি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
রাজধানীবাসীর জনজীবনে মশার উপদ্রব এখন স্থায়ী দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। কয়েল, অ্যারোসল, বৈদ্যুতিক ব্যাট কিংবা মশারি—কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি দিতে পারছে না। অপরিচ্ছন্ন ড্রেন, খাল ও নির্মাণস্থলের বদ্ধ পানি মশার প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত। অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থবির পানিতে লার্ভা জন্ম নেওয়ায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার শঙ্কাও বাড়ছে। এতে জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ আর উদ্বেগ।
নগরবাসীর অভিযোগ, নিয়মিত ফগিং ও সচেতনতামূলক প্রচারণার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে মশার উপদ্রব কমছে না; বরং অনেক এলাকায় পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ফলে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে দুই সিটির ব্যর্থতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। নগরবাসী বলছেন, শুধু ওষুধ ছিটানো নয়—পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশনের উন্নয়ন ছাড়া এ সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
১২ ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ
দক্ষিণ সিটি সূত্র জানায়, মশা নিয়ন্ত্রণে মাসব্যাপী পরিচ্ছন্নতা ও ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু হয়েছে। এতে ওয়ার্ডগুলোকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ও সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে দক্ষিণ সিটির ১০টি অঞ্চলের ১২টি ওয়ার্ডকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো ৫, ১৪, ১৬, ১৮, ২২, ৩০, ৩৮, ৫৬, ৬০, ৬৪, ৬৫ ও ৭৩ নম্বর ওয়ার্ড। এছাড়া ১৯টি ওয়ার্ড মাঝারি এবং ২১টি ওয়ার্ড সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত।
এসব এলাকায় মনিটরিং জোরদার করতে সাতজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চার স্তরের তদারকি ব্যবস্থায় রয়েছে—ওয়ার্ড পর্যায়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যায়, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা/সচিব পর্যায় এবং প্রশাসক পর্যায়। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে যা দেখা গেছে, রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, শান্তিনগর, মালিবাগ ও শাহবাগ এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে খাল ও ড্রেনে মশার উপদ্রব চরমে। তাছাড়া ময়লার স্তূপগুলোর অবস্থা আরো ভয়াবহ। অনেক এলাকায় ড্রেনেজ সংস্কারের কাজ চলায় পয়োবর্জ্য ও ময়লা জমে একাকার হয়ে আছে। স্থবির পানিতে মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছে।
বনশ্রীর বাসিন্দা জয় আহমদ আমার দেশকে বলেন, মশার কারণে এক জায়গায় ঠিকমত দাঁড়িয়েও থাকা যায় না। দলবল নিয়ে ঘিরে ফেলে। মশার কামড়ে পায়ে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। কয়েল জ্বালাই, স্প্রে করি তবুও কোনো লাভ হয় না। তিনি বলেন, শিশুদের নিয়ে আমরা বড় সমস্যায় আছি। তিনি বলেন, ফগিং করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এতে কোনো মশা মরে না।
মালিবাগের জীবন আহমদ বলেন, ‘খাল-ড্রেনে জমে থাকা নোংরা পানিই মশার মূল উৎস। ঠিকমতো পরিষ্কার না করায় উপদ্রব বাড়ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মশারি টাঙিয়ে রাখি। এমনকি মশারির ভেতরেই বাচ্চাদের পড়াশোনা করাই। সিটি করপোরেশন থেকে আগের মতো মশক নিধনের ওষুধ দেওয়া হয় না। এজন্য শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই ডেঙ্গু ঝুঁকিতে আছি।
ইমামদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ
দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, মশক নিধনকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় ইমামদের সম্পৃক্ত করা হবে এবং মাইকিং কার্যক্রম চালানো হবে। এ সময় তিনি সতর্ক করে বলেন, নাগরিকরা যদি নিজ নিজ বাসা ও আশপাশের মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করেন, তবে অঞ্চলভিত্তিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।