স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণসহ অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের বিষয় নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ। এরই মধ্যে দুই শুটারকে নজরদারিতে আনা হয়েছে।
গত বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা মুছাব্বিরকে গুলি করেন। ওই সময় তার সঙ্গে থাকা আরেকজন গুলিবিদ্ধ হন। রাতেই মুছাব্বির মারা যান। এ ঘটনায় মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম গতকাল বৃহস্পতিবার অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনের নামে তেজগাঁও থানায় মামলা করেন।
মুছাব্বির হত্যার বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী গণমাধ্যমে বলেন, মুছাব্বির হত্যার ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার। ঘটনাটি ঘটিয়েছে রহমান। তাকে পাচ্ছি না। তাকে পেলেই সব বেরিয়ে যাবে। সে কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি করে।
এর আগে মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম গণমাধ্যমে বলেন, আমার স্বামী রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক কোনো সমস্যার কথা আমাদের বলতেন না। তবে প্রায়ই তার প্রাণনাশের হুমকির কথা জানাতেন। তিনি বলতেন, ‘আমার তো অনেক বেশি শত্রু হয়ে গেছে, হয় তো যেকোনো সময় আমাকে মেরে ফেলবে।’
মুছাব্বিরের রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি ও দখল নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয় পুলিশের তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। এছাড়া মুছাব্বির হত্যার ঘটনার পেছনে কারওয়ান বাজারে ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনার যোগসূত্রও খুঁজছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তেজগাঁওয়ের তেজতুরি বাজার এলাকায় (স্টার কাবাবের গলি) মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার পরই সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ। এরপর বুধবার রাত সাড়ে ১১টায় কারওয়ান বাজারে সবজি ব্যবসায়ী মো. ফারুক হোসেনকে হেফাজতে নেয় ডিবি। তিনি মহানগর যুবদল ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সহসভাপতি। রাত দেড়টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে মো. আব্দুল মজিদ মিলনকে হেফাজতে নেয় ডিবি। তিনি ২৬নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। অন্যদিকে মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা তেজগাঁও থানা পুলিশ তিনজনকে হেফাজতে নেয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হেফাজতে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা দুজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। ঘটনাস্থল থেকে ৭.৬৫ বুলেটের তিনটি খোসা উদ্ধার করেছি। এছাড়া কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি, ফার্মগেটে গ্যারেজ দখল ও রাজনৈতিক কারণগুলো সামনে রেখে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। আওয়ামী লীগ আমলে বহুবার কারাবরণ করেন, এমনকি গুমের শিকারও হন। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরই কারওয়ান বাজারের চাঁদা নিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির এক নেতাসহ একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় মুছাব্বিরের।
মুছাব্বির দলীয় নির্দেশনায় ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির জোটের প্রার্থী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে সমর্থন করেছিলেন বলেও জানান তার স্ত্রী। এটি নিয়েও বিরোধ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, গত বছর ২৯ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করলে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হত্যাকারীরা ঘটনার আগেই ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। হত্যার পর দুজন সামনের মূল সড়ক ধরে পালিয়ে যায়। পেছনের গলিতে ঢুকে পড়ে আরো দুজন। হঠাৎ এমন ঘটনায় সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সিসিটিভি ফুটেজে হত্যার পর দুজনকে পালাতে দেখা গেছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বুধবার রাতে কারওয়ান বাজারের সুপারস্টার হোটেলের দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিনের মতো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন মুছাব্বির। আড্ডা শেষে ৮টা ১০ মিনিটে মাসুদকে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। তারা ৮টা ২০ মিনিটে তেজতুরি বাজারে আহছানউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনের পাকা রাস্তায় পৌঁছালে অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজন তাদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকেন। এতে মুছাব্বিরের ডান হাতের কনুই, পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। তাকে বাঁচাতে সুফিয়ান বেপারি মাসুদ এগিয়ে গেলে তাকেও পেটের বাঁ পাশে গুলি করা হয়।
মাসুদও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা তাদের মৃত ভেবে গুলি করতে করতে পালিয়ে যায়। বিআরবি হাসপাতালে চিকিৎসকরা মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করার পর লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। আর মাসুদকে বিআরবি হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়। তিনি এখন শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।