সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকরা
দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করছে। তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে অসংক্রামক রোগে, যার মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী তামাক ব্যবহার।
এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তামাকপণ্যের কার্যকর মূল্যবৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের মতে, তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধি করলে এর ব্যবহার কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুহার হ্রাস পাবে।
সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ইউনাইটেড ফোরাম অ্যাগেইনস্ট টোব্যাকো ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত ‘অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে তামাকপণ্যের কার্যকর দাম বৃদ্ধি: চিকিৎসকদের বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ব্রি. জেনারেল (অব.) অধ্যাপক মো. ইউনুছুর রহমান। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাফিউন নাহিন শিমুল এবং জাতীয় বক্ষব্যাধী ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন।
তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সমন্বয়ক ডা. অরুনা সরকার সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশে ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ তামাক ব্যবহার। এছাড়া তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।
সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একত্রিত করে ১০ শলাকার প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। পাশাপাশি প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ এবং উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের মূল্যও যথাক্রমে ১৫০ টাকা ও ২০০ টাকা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান তামাক কর কাঠামো অত্যন্ত জটিল এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর নয়। বর্তমানে সিগারেটের চারটি মূল্যস্তর থাকায় ব্যবহারকারীরা সহজেই কমদামি স্তরে চলে যেতে পারেন, ফলে তামাক ব্যবহার কমছে না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের দামের ব্যবধান কম হওয়ায় তরুণ ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধূমপান নিরুৎসাহিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, প্রস্তাবিত কর ও মূল্য সংস্কার বাস্তবায়ন হলে একদিকে তামাকপণ্যের ব্যবহার কমবে, অন্যদিকে ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পাওয়া যাবে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। এই অতিরিক্ত অর্থ স্বাস্থ্য খাত সংস্কার, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং অসংক্রামক রোগ মোকাবেলায় ব্যয় করা সম্ভব হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ব্রিগে. জেনা. (অব.) অধ্যাপক মো. ইউনুছুর রহমান বলেন, তামাকপণ্যে কার্যকর করারোপ বিশ্বব্যাপী তামাক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর ও পরীক্ষিত পদ্ধতি। কার্যকর কর আরোপের মাধ্যমে তামাকপণ্যের দাম বাড়ানো হলে প্রায় ৫ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৪০৮ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৩৩৫ তরুণের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
এলআর