২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার (এসি) ও কম্প্রেসরের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আগের মতো ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। এতে স্বস্তি ফিরে এসেছে দেশের দেশীয় ইলেকট্রনিক্স শিল্পে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থানীয় ব্র্যান্ডের পণ্যের চাহিদা ও বিক্রি বাড়বে, একই সঙ্গে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উৎপাদকদের দাবি, ভ্যাট সহনীয় পর্যায়ে থাকলে ফ্রিজ ও এসির দাম ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে, ফলে বাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি দশকের শুরুতে ২০২১-২২ অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে ফ্রিজ, এসি ও কম্প্রেসর উৎপাদনে ভ্যাট হার ছিল শূন্য। পরবর্তী ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসি ও কম্প্রেসরে ভ্যাট শূন্য থাকলেও ফ্রিজ উৎপাদনে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। পরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফ্রিজ ও এসির ওপর ভ্যাট ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হার বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বাজারে দেশীয় ব্র্যান্ডের পণ্যের দামও বেড়ে যায় বলে জানান উৎপাদকরা। এতে বিক্রি কমে যায় এবং অনেক ক্রেতা পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
পাশাপাশি কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ভ্যাটের চাপ যুক্ত হয়ে উৎপাদন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয় অনেক প্রতিষ্ঠানকে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ হারান।
শিল্প উদ্যোক্তারা মনে করছেন, ভ্যাট আবার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে ফিরিয়ে আনা হলে বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের জন্য ফ্রিজ ও এসি ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে, ফলে চাহিদা বাড়বে এবং উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশে ফ্রিজ এখন শুধু বিলাসপণ্য নয়; খাদ্য সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একইভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এসির চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে।
বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহিদুল ইসলাম বলেন, “ফ্রিজ ও এসির ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এতে দেশীয় শিল্প সুরক্ষিত হবে এবং বাজার স্থিতিশীল থাকবে।” তিনি প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ধন্যবাদ জানান।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি’র পলিসি অ্যাডভাইজার এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী লিয়াকত আলী বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং উৎপাদন সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমে রপ্তানি আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উদ্যোক্তাদের মতে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। একসময় পুরো বাজার আমদানিনির্ভর থাকলেও বর্তমানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় পরিসরে ফ্রিজ ও এসি উৎপাদন করছে এবং দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে রপ্তানি বাজারেও প্রবেশ করেছে।
তাঁদের মতে, এ খাতে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তা, উৎপাদক ও সরকার—সবাই উপকৃত হবে।