নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (এসআইপিজি) সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমএস) সোমবার প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর: বন্ধ শ্রমবাজার খুলবে কি? শীর্ষক একটি লাইভ ওয়েবিনার আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর এবং বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে এ ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেশনটি সঞ্চালনা করেন এনএসইউ’র সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সমন্বয়ক সহযোগী অধ্যাপক সেলিম রেজা।
মালয়েশিয়াভিত্তিক বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী আশরাফুল আলম মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বিশেষ করে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা কর্মী এবং কারাগারে আটক বা সাজাভোগরত বাংলাদেশিদের নানা সংকট নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। তিনি ডকুমেন্টেশন জটিলতা, ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন, উচ্চ অভিবাসন ও নিয়োগ ব্যয়, কলিং ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যা, নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীলতা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য ও আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সেবার মান নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন।
মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি সুলতান জয়নাল আবিদিনের সিনিয়র লেকচারার ড. মো. মাহবুবুল হক বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু নিয়ে এখন পর্যন্ত শ্রমবাজার-সংক্রান্ত কোনো চুক্তির আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের সফরেও শ্রম অভিবাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তবে তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের সফর অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মী এবং মালয়েশিয়ায় আটক বা সাজাভোগরত কর্মীদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করবে। পাশাপাশি তিনি মালয়েশিয়ায় থাকা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে যথাযথ নীতিগত মনোযোগ দেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
এনএসইউর সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ও সদস্য ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামো রয়েছে। তাই আলোচনা শুধু শ্রম অভিবাসনে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করা জরুরি। তিনি বিশেষভাবে হালাল শিল্পকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বিনিয়োগ, বাণিজ্য, সার্টিফিকেশন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সেবা খাতে সহযোগিতার সুযোগের কথা বলেন।
বাংলাভিশন টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি ইমরুল কায়েস বলেন, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বসবাস ও কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের সংকটগুলোকে সরকারকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, ভবিষ্যৎ আলোচনায় শুধু নতুন কর্মী পাঠানোর বিষয় নয়, বরং বিদ্যমান কর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা, ডকুমেন্টেশন, কল্যাণ এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তিনি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সাশ্রয়ী নিয়োগব্যবস্থার ওপর জোর দেন, যাতে অসাধু সিন্ডিকেট এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
এনএসইউ’র সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সিনিয়র লেকচারার ও সদস্য এস এন আজাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কর্মীদের সাক্ষাৎ মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে আশা তৈরি করেছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, কেবল সফর দিয়ে দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার সংকট সমাধান হবে না; এর জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থায় দুর্বল প্রস্তুতি, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি অভিবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
এনএসইউ’র এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকে শুধু শ্রম অভিবাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার অর্থনীতি পরিবর্তিত হচ্ছে; তাই ভবিষ্যতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে মালয়েশিয়ার পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে।
ওয়েবিনারে শিক্ষাবিদ, অভিবাসন গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ অংশগ্রহণকারীরা যুক্ত ছিলেন। আলোচনার শেষে প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, টেকসই কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের অধিকতর সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।