বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ফর্টিফায়েড সয়াবিন তেলের কোনো নমুনায় ভারী ধাতুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, এমপি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) খোলাবাজার থেকে ১৯৩টি ফর্টিফায়েড সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করে নিজস্ব অ্যাক্রেডিটেড পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করেছে। পরীক্ষায় কোনো নমুনাতেই ভারী ধাতুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণার ফলাফলে সয়াবিন তেলে বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পমন্ত্রী এ বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাজারে সব সয়াবিন তেল বিশুদ্ধ এবং এতে কোনো ভারী ধাতু নেই।
বুধবার রাজধানীর অফিসার্স ক্লাব ঢাকায় বিশ্ব মান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শিল্পমন্ত্রী। এবারের বিশ্ব মান দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Shared vision for a better world—Affordable and Clean Energy’, যার বাংলা অর্থ ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব—সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’।
অনুষ্ঠানে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হকের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল। মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এফসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিএসটিআইয়ের পরিচালক (মান) মো. সাইদুল ইসলাম।
আলোচনা সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, আমদানি ও রপ্তানিকারক এবং মান প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ বন্ধে নজরদারি জোরদার ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিএসটিআইয়ের জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এমনভাবে সম্প্রসারণ করতে চান, যাতে দেশের সব জায়গায় কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা যায়।
শিল্পমন্ত্রী আরও বলেন, নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
বিশ্ব মান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (বিএবি) কাছ থেকে হালাল সার্টিফিকেশন অ্যাক্রেডিটেশন সনদ অর্জন করেছে বিএসটিআই।
অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের মাধ্যমে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হকের হাতে সনদ তুলে দেন বিএবির মহাপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম।
হালাল সার্টিফিকেশন অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনের ফলে হালাল পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ, সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিএসটিআইয়ের ন্যাশনাল হালাল ল্যাবরেটরির অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনের ফলে দেশীয় উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন দেখে একজন ক্রেতার মনে পণ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আস্থা তৈরি হওয়াই প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় অর্জন।
তিনি বলেন, কোনো অর্জনই সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সবার সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ যেন পণ্যের মান, আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক হয়ে ওঠে, সে লক্ষ্যে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
নকল, ভেজাল এবং বিএসটিআইয়ের মানচিহ্নের অবৈধ ব্যবহার রোধে পৃথক গোয়েন্দা ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক।
তিনি বলেন, নকল ও ভেজালের প্রবণতা যেভাবে বাড়ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি বিশেষায়িত ‘এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ চালু করা প্রয়োজন। ইউনিটটি সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
কাজী ইমদাদুল হক বলেন, ‘মান শুধু একটি কাগজের সনদ নয়, এটি নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের আস্থার চুক্তি।’ রাষ্ট্রের সেই দায়িত্ব পালনে বিএসটিআই কাজ করে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সক্ষমতা ও অর্জনের বিষয় তুলে ধরেন মহাপরিচালক।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল বলেন, বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে বিএসটিআই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী, সবুজ প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে বাংলাদেশি মান প্রণয়ন ও পরীক্ষার সুবিধা সৃষ্টি নিঃসন্দেহে এসডিজি বাস্তবায়নে একটি বড় পদক্ষেপ।
অনুষ্ঠানের মুখ্য আলোচক এফসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, বিএসটিআইয়ের হালাল সার্টিফিকেশনে অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন বৈশ্বিক হালাল পণ্যের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
নকল ও ভেজাল রোধে নিজেদের স্বার্থেই বিএসটিআইকে সব দিক থেকে সহযোগিতা করা এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের এই প্রশাসক।