দেশের মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য আরও ৪৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের রিভলভিং তহবিল থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় এ ঋণ বিতরণ করা হবে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী এ ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ।
এছাড়া বিদেশফেরত প্রবাসীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর সহযোগিতায় কর্মসংস্থান ব্যাংক-এর মাধ্যমে বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। এ ঋণের সুদের হার হবে ৭ শতাংশ। একজন উদ্যোক্তা সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। তবে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের উদ্যোক্তারা ৯ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন।
এ লক্ষ্যে মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাতে রাজধানীর একটি হোটেলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক এবং কর্মসংস্থান ব্যাংক-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং অংশীদার ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীরা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আব্দুন নাসের খান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. মোখতার আহমেদ, ম্যাক্স টিউনন, মো. আসাদুজ্জামান, মো. সাইফুল ইসলাম এবং নূরুন নাহার।
স্বাগত বক্তব্য দেন আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন মো. নাজিম হাসান সাত্তার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, “আজ আমরা এমন একটি উদ্যোগের সূচনা করছি, যার মাধ্যমে রেমিট্যান্সকে উদ্যোক্তায়, উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগে এবং বিনিয়োগকে কর্মসংস্থানে রূপান্তরের একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি হবে। দেশের সম্ভাবনাময় নারী, যুব, প্রত্যাগত অভিবাসী ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অংশীদার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জামানতবিহীন ঋণ বিতরণে উৎসাহিত করা হবে। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে কোনো জামানত নেওয়া হবে না। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা সর্বোচ্চ চার বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রাহক-ব্যাংক সম্পর্কের ভিত্তিতে ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৪৮টি মাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকবে।
ঋণ বিতরণে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে নারী উদ্যোক্তা, এসএমই ক্লাস্টার, উৎপাদনমুখী শিল্প, রপ্তানিযোগ্য ও আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তা, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের ব্যবসায়ী এবং বিদেশফেরত অভিবাসীদের।
ফাউন্ডেশন জানায়, মোট তহবিলের অন্তত ২৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের, ২০ শতাংশ এসএমই ক্লাস্টারের উদ্যোক্তাদের এবং ৬০ শতাংশ উৎপাদন খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি অন্তত ৩০ শতাংশ ঋণ ১০ লাখ টাকা বা তার কম পরিমাণে বিতরণের বাধ্যবাধকতা থাকবে।
তবে অনুৎপাদনশীল খাত যেমন মুদি দোকান, ওষুধ বিক্রেতা, হার্ডওয়্যার ব্যবসা বা পরিবেশ দূষণকারী কোনো কার্যক্রমের জন্য এ কর্মসূচির আওতায় ঋণ দেওয়া হবে না।
এসএমই ফাউন্ডেশন আরও জানায়, ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। ঋণ বিতরণের পর সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃত উদ্যোক্তার কাছে অর্থ পৌঁছেছে কি না তা যাচাই করা হবে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে এসএমই ফাউন্ডেশন ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১৩ হাজার সিএমএসএমই উদ্যোক্তার মধ্যে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠানের ৯৯ শতাংশই কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এ খাতেই সৃষ্টি হয়েছে এবং এতে তিন কোটিরও বেশি মানুষ কর্মরত রয়েছে।
২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান এসএমই ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধাভোগীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২২ লাখ, যার ৬০ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় শিল্পনীতি, এসএমই নীতিমালা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।