গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পের মেশিনারি, ইয়ার্ন, ফেব্রিকস, অ্যাকসেসরিজ, ডাইস্টাফ, কেমিক্যালস ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শনে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ‘টেক্সটাইল সিরিজ অব এক্সিবিশন্স ২০২৬’।
কনফারেন্স অ্যান্ড এক্সিবিশন ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস (সেমস-গ্লোবাল) ইউএসএ-এর আয়োজনে বুধবার থেকে রাজধানীর পূর্বাচলে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে এ প্রদর্শনী শুরু হয়। চলবে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
টেক্সটাইল সিরিজের আওতায় এবারের আয়োজনে রয়েছে ‘২৫তম টেক্সটেক বাংলাদেশ ২০২৬ ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো’, ‘২৬তম ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার্ন অ্যান্ড ফ্যাব্রিক শো ২০২৬—সামার এডিশন’ এবং ‘৫৩তম ডাই+কেম বাংলাদেশ ২০২৬ ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো’।
বুধবার প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেমস-গ্লোবাল ইউএসএ অ্যান্ড এশিয়া প্যাসিফিকের প্রেসিডেন্ট ও গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেহেরুন এন. ইসলাম। প্রধান অতিথি ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বস্ত্র অধিদপ্তরের সচিব ও মহাপরিচালক ড. মো. আবদুস সবুর।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুলতানা ইয়াসমীন এবং বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসাইন। শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি মেজর মো. সাইফুল ইসলাম, পিএসসি, সিএসসিএম (অব.) এবং বিকেএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অমল পোদ্দার, সিআইপি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেহেরুন এন. ইসলাম বলেন, ২৪ বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছর ২৫তমবারের মতো টেক্সটাইল সিরিজের বাংলাদেশ সংস্করণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ তিনটি প্রদর্শনী বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী এবং ক্রেতা-সরবরাহকারীদের জন্য একটি বড় বিজনেস-টু-বিজনেস (বি-টু-বি) প্ল্যাটফর্ম।
তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের একই ছাদের নিচে নিয়ে আসার ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিদেশে গিয়ে ক্রেতা খোঁজা কিংবা ভিসা জটিলতায় পড়ার প্রয়োজন কমবে। এতে অর্থ, শ্রম ও সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও অংশীদারত্বের সুযোগ বাড়বে।
মেহেরুন এন. ইসলাম আরও বলেন, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পে বাংলাদেশের দীর্ঘ ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বাংলাদেশকে একটি বিজনেস হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠায় এসব প্রদর্শনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতা ও বিক্রেতাদের বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে পর্যটন ও মাইস শিল্পেরও সম্প্রসারণ ঘটবে।
আয়োজকদের মতে, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা, পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্প, উৎপাদনশীলতা, আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স এবং টেকসই উৎপাদনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এই পরিবর্তনের ধারায় টেক্সটাইল সিরিজ বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প ও বৈশ্বিক টেক্সটাইল সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।
‘২৫তম টেক্সটেক বাংলাদেশ ২০২৬’-এ আধুনিক পোশাক ও টেক্সটাইল প্রযুক্তি, অটোমেশন এবং স্মার্ট মেটেরিয়ালস ও মেশিনারি প্রদর্শন করা হচ্ছে। ‘২৬তম ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার্ন অ্যান্ড ফ্যাব্রিক শো ২০২৬’-এ আন্তর্জাতিক মানের সুতা, কাপড়, ট্রিমস ও অ্যাকসেসরিজ প্রদর্শনের মাধ্যমে বৈশ্বিক সোর্সিংয়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। আর ‘৫৩তম ডাই+কেম বাংলাদেশ ২০২৬’-এ টেকসই ও পরিবেশবান্ধব টেক্সটাইল উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ডাইস্টাফ ও বিশেষায়িত কেমিক্যালস প্রদর্শন করা হচ্ছে।
এবারের প্রদর্শনীতে টেকসই উৎপাদন, পণ্যের উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, দ্রুত সরবরাহ, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং উৎপাদনে নমনীয়তার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল উৎপাদন প্রযুক্তি ও তথ্যনির্ভর উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আয়োজকদের তথ্যমতে, সেমস-গ্লোবাল ইউএসএ আয়োজিত টেক্সটাইল সিরিজ অব এক্সিবিশন্সের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ছাড়াও ব্রাজিল, মরক্কো, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় প্রতিবছর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এবারের প্রদর্শনীতে ৩৭টি দেশের প্রায় ১ হাজার ৪৭৫টির বেশি কোম্পানি ২ হাজার ২৪৫টিরও বেশি বুথে অংশ নিচ্ছে। এতে ১৬ হাজারের বেশি ব্যবসায়িক দর্শনার্থীর সমাগম হবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।
চার দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীতে দেশি-বিদেশি প্রস্তুতকারক, কারখানার মালিক, প্রধান নির্বাহী, উৎপাদন ব্যবস্থাপক, মার্চেন্ডাইজার, সোর্সিং কর্মকর্তা, বায়িং হাউস, প্রকৌশলী, ডিজাইনার, আমদানিকারক, পরিবেশক ও আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা অংশ নিচ্ছেন। ফলে নতুন প্রযুক্তি ও কাঁচামাল সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, নতুন সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রদর্শনীর পাশাপাশি চার দিনজুড়ে পাঁচটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পের উদ্ভাবন, টেকসই উন্নয়ন, বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ও লজিস্টিকস, স্থাপত্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন নিয়ে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করছেন।
বুধবার প্রথম দিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত টেক্সটাইল টুডের সহযোগিতায় ‘বিল্ডিং ইনোভেশন ইকো-সিস্টেম ফর এ সাসটেইনেবল টি অ্যান্ড এ ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়।
৩ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে ৩টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খালিদ ওয়াটার টেকের সহযোগিতায় ‘অ্যাডভান্সড টেকনোলজিস ইন ওয়েস্টওয়াটার ট্রিটমেন্ট ফর হায়ার ওয়াটার রিকভারি’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। একই দিন বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (আইবিসিসিআই) ও সেমস-গ্লোবালের যৌথ উদ্যোগে ‘অ্যাডভান্সিং বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া টেক্সটাইল ভ্যালু চেইনস থ্রু সিমলেস লজিস্টিকস অ্যান্ড ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন’ শীর্ষক সেমিনার হবে।
৪ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আর্কিকানেক্টের সহযোগিতায় ‘আর্কিটেকচারাল ট্রেন্ডস ইন দ্য টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।
সমাপনী দিন ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির সহযোগিতায় ‘ফিউচার-প্রুফিং বাংলাদেশ’স আরএমজি, টেক্সটাইল অ্যান্ড ফ্যাশন ওয়ার্কফোর্স ইন দ্য এজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স: ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া স্ট্র্যাটেজিজ ফর সাসটেইনেবল এমপ্লয়মেন্ট’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।
এবারের প্রদর্শনীতে বিশেষ সংযোজন হিসেবে হল বি-তে রাখা হয়েছে ‘ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন জোন’। এখানে টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে।
এই জোনে এআই ও অটোমেশন, ইআরপি, স্মার্ট ফ্যাক্টরি, আইওটি, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০, ডেটা অ্যানালিটিকস, ক্লাউড, সাইবারসিকিউরিটি এবং টেকসই উৎপাদন ও ট্রেসেবিলিটি প্রযুক্তির বিভিন্ন সমাধান প্রদর্শন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মধ্যে যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
আয়োজক সেমস-গ্লোবাল ইউএসএ নিউইয়র্কভিত্তিক একটি বহুজাতিক প্রদর্শনী ও সম্মেলন আয়োজক সংস্থা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি শিল্পখাত, উৎপাদক, সরবরাহকারী, ক্রেতা, ব্যবসায়িক সংগঠন ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে কাজ করছে।
বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত প্রদর্শনী প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে। সংশ্লিষ্ট দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শনী উন্মুক্ত থাকবে।