হোম > আইন-আদালত

অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালাও বাতিল হচ্ছে

অধস্তন আদালত

সাইদুর রহমান রুমী

প্রতীকী ছবি

স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয় ও বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলের পর এবার বাতিল হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত অধস্তন আদালত কর্মচারী নিয়োগসংক্রান্ত বিধিমালা। পতিত আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে আদালতের বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকার এ আইনটি করেছিল। নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন আনতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনকে (বিজেএসসি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটা বাতিল করে জেলা কমিটির মাধ্যমে আগের নিয়োগ প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সময়ে দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে পাঁচ হাজারের বেশি কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সুপারিশ করতেন। জেলা জজের নেতৃত্বে কথিত এসব নিয়োগ কমিটি নামকাওয়াস্তে পরীক্ষা নিলেও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং জজদের কাছের লোকজনই নিয়োগ পেত। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জেলা জজদের যোগসাজশে নিম্ন আদালতের এসব কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক ঘুস-বাণিজ্য ও অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে শেষ পর্যন্ত দুদক ও উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে অধস্তন আদালতগুলোতে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত জেলা জজ, যুগ্ম জেলা জজ এবং সিনিয়র সহকারী জজদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হতো। তারা প্রার্থী বাছাই করে জেলা জজের কাছে সুপারিশ পাঠাতেন এবং তিনি চূড়ান্ত নিয়োগ দিতেন। কিন্তু বাস্তবে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল ও প্রতিমন্ত্রী কামরুলের নির্দেশে আইন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ব্যাপক দুর্নীতি ও ঘুসের লেনদেন চলত। এই দুর্নীতির সঙ্গে কমিটির সদস্য এবং জেলা জজদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। সেই সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় পাঁচ হাজার কর্মচারীর মধ্যে অর্ধেকের বেশি কর্মচারীই নিয়োগ পেয়েছেন মন্ত্রীর এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে।

আদালত সূত্র জানায়, রাজনৈতিক বিবেচনা ও ঘুসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এসব অথর্ব কর্মচারী দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনায় অধস্তন আদালতগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আদালতগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা ও স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। কারণ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেশিরভাগের আদালতের কাজের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল না।

আদালতের কার্যক্রম জোরদার এবং কাজে স্বচ্ছতা আনতে অন্তর্বর্তী সরকার পরবর্তীতে নিয়োগবিধি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়। অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত নতুন আইনে অনিয়ম ও ঘুস-বাণিজ্য দূর করতে এসব নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয় বিজেএসসিকে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ বিধির আগে আইনটি ছিল জেলা জজ ও অধস্তন আদালতগুলো (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮৯ এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির আদালতগুলো (সহায়ক কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০০৮। অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন আইনটির বিষয়ে গত বছরের অক্টোবরে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন নিয়োগবিধিতে রয়েছে, নির্দিষ্ট পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলা জজ নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবেন, তবে প্রার্থী বাছাই করবে বিজেএসসি। কমিশন লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করবে। এরপর বাছাই করা প্রার্থীদের তালিকা জেলা জজের কাছে পাঠাবে। জেলা জজকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে। কোনো পদ শূন্য হওয়ার এক মাসের মধ্যে জেলা জজকে শূন্য পদের তথ্য কমিশনের কাছে পাঠাতে হবে । কমিশন বছরে এক বা একাধিকবার কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। প্রয়োজনে মৌখিক পরীক্ষার জন্য জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের নিয়ে বোর্ড গঠন করা যাবে এবং বিশেষজ্ঞ সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

বিজেএসসি সূত্র জানায়, তারা কয়েক দফায় পাঁচ শতাধিক কর্মচারী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দিয়েছে, যা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু মেধাভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত স্বচ্ছ আইনটি বাদ দিয়ে আবারো আগের নিয়মে ফেরত যাবার সিদ্ধান্তটি বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্টরা ভালো চোখে দেখছেন না। তারা বলছেন, এতে তরুণ প্রজন্মের মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের দাবি উপেক্ষিত হবে। নিয়োগে আবারো ভাগ-বাটোয়ারা ও দুর্নীতি প্রাধান্য পাবে।

আইন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের আইনটি বাতিল করে অধস্তন আদালত কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতির নতুন বিধিমালা প্রস্তাবনা ইতিমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি যাচাই-বাছাইয়ের পর তাদের সবুজ সংকেত পাবার পরপরই সরকার তা আইনে পরিণত করতে উদ্যেগ নেবে। বিজেএসসি কর্মচারী নিয়োগে অত্যন্ত ধীরগতির পরিচয় দিচ্ছে, যা অধস্তন আদালতের শত শত শূন্যপদ পূরণে অনেক সময় লেগে যাবে। এ কারণেই আমরা আইনটি পরিবর্তনের সুপারিশ করেছি।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অধস্তন আদালতের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুলের নির্দেশে গঠিত সিন্ডিকেট জনপ্রতি ১০-১৫ লাখ টাকা ঘুস নিয়ে অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয় বলে অভিযোগ ওঠে।

সেই সময় সিরাজগঞ্জ, ভোলা ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলা জজ ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কর্মচারী নিয়োগে জজের খাস কামরায় বসিয়ে নেওয়া হয় পরীক্ষা। এর কিছু ছবি ভাইরাল হয় তখন। অনিয়মে জড়িত জেলা জজের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত এখনো চলমান। সিরাজগঞ্জের সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ফজলে খোদা নাজিরসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, ২০২২ সালে সিরাজগঞ্জ জজ আদালত ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। নিয়োগ পাওয়া ৩৪ কর্মচারীর মধ্যে ২২ জনই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়।

একই বিষয়ে ভোলা কোর্টে কর্মচারী নিয়োগের অনিয়মের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে গড়িয়েছিল। জিয়াউল হক নামে একজন নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২১ সালের ২১ এপ্রিল রুল জারি করে হাইকোর্ট, যাতে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর নিয়োগ বাতিল হওয়া ব্যক্তিরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন এবং ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর সিভিল পিটিশনের চেম্বার জজ আদালতে শুনানি হয়। পরে গত বছরের ৪ মার্চ ফুল বেঞ্চে পাঠানো হলেও তা আজও নিষ্পত্তি হয়নি। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় পরীক্ষা ছাড়াই কেবল সুপারিশে ভোলা জেলা জজ কোর্টে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা এখনো বহাল তবিয়তে । এভাবে সারা দেশে আনিসুল-কামরুলের সময়ে অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তরা এখনো বহাল তবিয়তেই রয়েছে। তারা এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন অধস্তন আদালতের বিভিন্ন কাজকর্ম।

এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু আমার দেশকে বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় আবারো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ফেরত যাওয়া মানে মেধাবীদের মূল্যায়ন না করার চেষ্টা। এ কারণেই জুলাই আন্দোলন হয়েছিল। তাই এটি বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারকে বুঝতে হবে।

প্রতারণা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিদিশার আপিল, জামিন নামঞ্জুর

হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ফের পেছাল

ফ্ল্যাট দুর্নীতি মামলায় টিউলিপের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন ফের পেছাল

জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে মামলা

রানা প্লাজা ভবন নির্মাণে দুর্নীতি, রানাসহ ৮ জনের রায় পিছিয়েছে

মালয়েশিয়া যেতে ১৭ হাজার কর্মীকে অগ্রাধিকারের নির্দেশ হাইকোর্টের

সংসদ ভবনের সামনে শিক্ষিকা নিহত: তিন আসামির ৫ দিনের রিমান্ড

ছাত্রলীগ নেত্রী কেয়া রিমান্ডে

হাদি হত্যায় মূল অভিযুক্ত ফয়সাল ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

বিমানবন্দরে স্বর্ণালংকার ছিনতাই, বিএনপি-ছাত্রদলের দুই নেতা কারাগারে