জুলাইয়ে সুজন হত্যা
জুলাই গগণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলায় গুলিতে ট্রাক চালক সুজন নিহতের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি)।
তদন্তে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ওবায়দুল কাদেরদের নির্দেশে শিক্ষার্থীদের নিধনের ঘোষণা আসে। আর তা বাস্তবায়ন করেন তারিকুজ্জামান রাজিব, আসিফ আহম্মেদ সরকার ও সলিমউল্লাহ সলুরা। আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান অভিযোগপত্র জমা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ মামলায় আগামি ৮ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
গত ১১ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের ইন্সপেক্টর শংকর কুমার ঘোষ এ অভিযোগপত্র জমা দেন। তবে এজাহারনামীয় ৪৭ আসামিসহ অজ্ঞাতনামা ৪৫০-৫০০ জনের প্রকৃত ও সঠিক নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করতে না পারায় তাদের মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন তদন্তকর্তা।
অভিযোগপত্রের উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানক, সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান, সাবেক কাউন্সিলর তারিকুজ্জামান রাজিব, আসিফ আহম্মেদ সরকার ও সলিমউল্লাহ সলু।
অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- মাহবুবুল আলম, আলম হোসেন, আরিফ, ফাহিম খান, রিয়াজ মাহমুদ, নজরুল ইসলাম, পীযূষ বাবু, মাসুদ ওরফে কালা মাসুদ, দেলোয়ার, বশির মোল্লা।
চার্জশিটে শেখ হাসিনাসহ আসামিদের তদন্তকর্তা শংকর কুমার অভিযোগ করেন, “২০২৪ সালের ৫ জুনের পর সরকারী চাকুরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা আরোপ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু করে সারাদেশের সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার সম্বোধন’ করলে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দেয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন প্রতিহত করতে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল পান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আসাদুজ্জামান খান কামাল, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, আনিছুল হক, সাদেক খান, মোহাম্মদ এ আরাফাতের হুকুমে শিক্ষার্থীদের নিধনের ঘোষণা দিলে তারিকুজ্জামান রাজীব, আসিফ আহমেদসহ অন্যরা ২০ জুলাই রাত ৮ টার দিকে মোহাম্মদপুরের বছিলা রোডস্থ তিন রাস্তার মোড়ে শান্তপূর্ণ মিছিলে দেশিয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় এবং গুলিবর্ষণ করে।”
এতে আরো বলা হয়, “সুজন পেশায় একজন ট্রাকচালক। সে তার ট্রাকটি মোহাম্মদপুর মোহাম্মদপুর থানাধীন বেড়িবাধস্থ লাওতলা পার্কিংয়ে রাখার জন্য সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়। পরে তিন রাস্তার মোড়ে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে চিকিৎসার জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি খারাপ থাকায় ওইদিনই ১৫ হাজার টাকায় পিকআপ ভাড়া করে ভোলার বোরহানউদ্দিন থানাধীন সাচড়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে রামকেশব গ্রামের জালাল হাওলাদার বাড়ির জামে মসজিদের পেছনে দাফন করা হয়।”
মামলা সম্পর্কে বাদী সুজনের ভাই রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমার ভাইকে মেরে ফেললো। তাকে তো আর ফেরত পাবো না। যেহেতু মামলার চার্জশিট দিয়েছে, আইন অনুযায়ী আসামিদের বিচার চাই।”
তিনি আরো বলেন, সুজন যখন মারা যায় তখন তার ভাইয়ের ছেলে শুভর বয়স মাত্র দুই বয়স। ছেলেটির বয়স এখন প্রায় চার বছর। চাচার কাছেই বড় হচ্ছে সে। আখের রস বিক্রিতে রফিকুলের সংসার চলছে।
তিনি বলেন, “বাবার কথা মাঝে মধ্যে বলে শুভ। একথা, ওকথা দিয়ে আদার-ভালোবাসা দিয়ে ভুলিয়ে রাখি।”
মোহাম্মদপুর থানায় ট্রাক চালক সুজন হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ২২ অগাস্ট শেখ হাসিনাসহ ৭৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও সাড়ে চারশ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করে মামলাটি করেন সুজনের ভাই রফিকুল ইসলাম।
মামলার অভিযোগ করা হয়, শেখ হাসিনারসহ আসামিদের নির্দেশনায়, পরিকল্পনায় এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণে গত ২০ জুলাই রাতে বছিলায় শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি করা হয়। এতে তার ভাই ট্রাকচালক সুজন আহত হন। পরে তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।