ট্রাইব্যুনালে নাজিম উদ্দিনের সাক্ষী
আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন ভুক্তভোগী নাজিম উদ্দিন।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জবানবন্দিতে নাজিম বলেন, আমার নাম নাজিম উদ্দিন। বর্তমান বয়স ৪৮ বৎসর। আমার ঠিকানা গ্রাম- দূর্গাপুর, পোস্ট ও উপজেলা-মনিরামপুর, জেলা-যশোর।
আমি একজন কম্পিউটার ব্যবসায়ী। স্থানীয় বিএনপি রাজনীতির সাথে জড়িত। আমি যুবদল মনিরামপুর পৌরশাখার দপ্তর সম্পাদক ছিলাম। আমি মনিরামপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দপ্তর সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি।
২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ এবং ভারতের বিপক্ষে ফেসবুকে লেখালেখি করতাম। সে কারণে অনেকের শত্রু হয়ে যাই। এটা বুঝতে পেরে ঢাকায় ব্যবসা শুরু করার জন্য ঢাকায় চলে আসি।
মিরপুর ডিওএইচএস এর ভিতরে আমি একটি অফিস ভাড়া নেই। ২৫ মে ২০১৬ সালে আনুমানিক সকাল ১১টায় মিরপুর-১২ বিআরটিএ বাস স্ট্যান্ডের বিপরীত দিকে মোল্লা টাওয়ার থেকে অফিস ভাড়া সংক্রান্ত চুক্তিনামার কিছু কাগজপত্র ফটোকপি করে বের হলে কালো রংয়ের একটি হাইস মাইক্রোবাস আমার গতিরোধ করে। ওই মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন বের হয়ে একজন মোটরসাইকেলের পিছনে বসে আমার ঘাড় ধরে ফেলে। একজন এসে আমার মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে যায়। আরেকজন আমাকে আমার নাম জিজ্ঞাসা করে। আমি নাজিম বললে তারা আমাকে তাদের সঙ্গে যেতে বলে।
জবানবন্দিতে নাজিম বলেন, তারা আমাকে একটি বিল্ডিংয়ে উঠায়। তখন কেচিগেট খোলার শব্দ পাই। একটি লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরতে দেয়। পরে একটি রুমে নিয়ে আমাকে একটি চেয়ারে বসায়। সেখানে নাম ও পুরো ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে। এরপর বলে "নাজিম উদ্দিন" নামক আইডিটা কে চালায়। আমি নিজে চালাই স্বীকার করলে তারা হাসাহাসি করে। হঠাৎ করে তারা একটি লাঠি দিয়ে আমার দুই উরুতে ও পিঠে আঘাত করতে থাকে এবং বলে আমরা যা বলবো তাই করবে। তারপর আমাকে ওই রুম থেকে বের করে। প্রথমে বাম দিকে নিয়ে যায়। তারপর একটু সামনে নিয়ে একটি দরজা খোলে এবং একটু সামনে নিয়ে ডান পাশের একটি সেলের ভিতরে ঢুকায়।
এরপর আমার চোখ এবং হাত খুলে দেয়। আমি নিজেকে আনুমানিক ৮ ফুট বাই ১১ ফুট একটি ঘরের ভিতর দেখতে পাই। যার এককোণায় একটি কাঠের চৌকি আর একটি প্লাস্টিকের পট ছিল। প্রথম ২-৩ দিন আমি ঘোরের মধ্যে ছিলাম বিধায় কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। ২-৩ দিন পর একটু স্বাভাবিক হলে খেয়াল করি যে, ঘরের দেওয়ালে প্রচুর লেখালেখি করা আছে।
আমি সেগুলো পড়ি এবং সেখানে বিভিন্ন মানুষের নাম, মোবাইল নম্বর ও আর্তনাদ লেখা আছে। এর ভিতরে একটি লেখা ছিল "এটা ডিজিএফআই এর হেডকোয়ার্টার জেআইসি সেল”। আমি দীর্ঘ তিন বছর বনানীস্থ ডেফোডিল কম্পিউটার নামীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাদে আমি পুরো এলাকাটি কমবেশি চিনি। আমি যখন কম্পিউটার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম তখন ডিজিএফআইয়ের ১৪তলা বিল্ডিংটি অনেকবার দেখেছি।
পরবর্তীতে আমি খেয়াল করি পার্শ্ববর্তী মসজিদ থেকে মাঝে মধ্যে পূর্ব কাফরুল নিবাসী বিভিন্ন মানুষের মৃত্যু এবং জানাজা সংক্রান্ত ঘোষণা শুনতে পেতাম। জেআইসি বন্দিশালায় থাকার সময় প্রতিনিয়ত বিমান উঠা-নামার শব্দ শুনতে পেতাম। পরবর্তীতে আমি দেওয়ালের লিখন, বিমানের উঠা-নামা এবং পূর্ব কাফরুল মসজিদের ঘোষণা ইত্যাদির মাধ্যমে নিশ্চিত হই আমি ডিজিএফআই এর অধীনে আছি। সেখানে থাকা অবস্থায় তারা আমার জীবনী লেখার জন্য কাগজ-কলম দিয়ে সময় বেঁধে দিত। সময়ের ভিতরে লেখা শেষ করতে না পারলে ঘুমাতে দিত না। প্রথম ১০ দিনে আমাকে ৪ বার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
পরবর্তীতে ১৫-২০ দিন পর পর ওই রুমে নিয়ে একদিন জিজ্ঞাসাবাদ করতো। আমি কেনো আওয়ামী লীগ ও ভারতে বিরুদ্ধে লেখালেখি করি তা জানতে চায়। আমার সাথে স্থানীয় রাজনীতিতে কারা কারা জড়িত আছে তাও জানতে চায়। আমার সাথে কারো সম্পর্ক নাই বললে আমার উপর নির্যাতন চালানো হত।