জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া
২০০৯ সালে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ চরমভাবে বেড়ে যায়। সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে। পেশাদার অফিসারদের একপাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করে বাহিনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। কারণ শেখ হাসিনা ভাবতেন—একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে জবানবন্দিতে এসব কথা উল্লেখ করেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্বল দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ ও প্রশাসনের ওপর তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন। এ জন্য তিনি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেন। এ সময় তিনি তার আত্মীয় তারেক সিদ্দিকীকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। তার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সচেষ্ট হন।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তারিক সিদ্দিকী অচিরেই বাহিনীর প্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব, এনটিএমসি, আনসার, বিজিবি ইত্যাদি সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে চারটি চক্রের উদ্ভব ঘটে।
প্রথম চক্রটি সেনাবাহিনীর ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব, এনটিএমসি নিয়ে পরিচালিত হতো। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন ও গুমের মতো ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে।
দ্বিতীয় চক্রটি ডিপ স্টেট। এটি পরিচালনা করতেন এমএসপিএম, ডিজিএফআই, এনএসআই ইত্যাদির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে তিনি বাহিনী সম্পর্কে সমস্ত নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতেন। এগুলো অনেক ক্ষেত্রে বাহিনীর প্রধানদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।
তৃতীয় চক্রটি ছিল কেনাকাটা চক্র। এটিতে যুক্ত ছিল পিএসও, এএফডি, ডিজিএফআই ও তিন বাহিনীর প্রধান ইত্যাদি। এর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কেনাকাটার প্রভাব বিস্তার করেন।
চতুর্থ চক্রটি ছিল সামরিক প্রকৌশলী চক্র। তারেক সিদ্দিকী ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের অফিসার হওয়ায় তিনি ইঞ্জিনিয়ার কোরের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে আলাদা চক্র গড়ে তোলেন। এদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পের তার প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। এটি ছিল অনৈতিক অর্থ আয়ের প্রধান উৎস।
র্যাবের বিষয়ে ইকবাল করিম বলেন, সেনাপ্রধান হওয়ার পূর্বে তিনি অন্যান্য সামরিক সদস্যদের মতো র্যাব সদস্যের অবৈধ ও বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম সম্পর্কে অভিহিত ছিলেন। সেনাপ্রধান হওয়ার পরেই তিনি র্যাবের এডিজি তৎকালীন কর্নেল মুজিবকে (পরবর্তী সময়ে লেফটেনেন্ট জেনারেল) অফিসে ডেকে আনেন এবং এসব ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলেন। জিয়াউল হাসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলেন। তিনি কথা দেন—এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। পরবর্তী কিছুদিন পত্রপত্রিকায় এসব ঘটনা দেখা যায়নি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করতে পারেন, ঘটনা ঘটছে কিন্তু চাপা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ডিরেক্টর অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল ও কমান্ডিং আর্মি অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল বলেন, তিনি জিয়াউলের কাছ থেকে ভালো প্রতিশ্রুতি পাননি। ব্রিগেডিয়ার ফজল জানান, কথা বলে কোনো উন্নতি হয়নি। জিয়াউল তার বাসায় অস্ত্র, বডিগার্ড ও সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে। তাকে সামরিক কোয়ার্টারের নিয়ম-কানুন মেনে এগুলো পরিত্যাগ করতে বলা হয়। পরে জিয়াউল তারেক সিদ্দিকী ও তার কোর্সমেট মাহবুবের ছত্রছায়ায় আদেশ অমান্য করতে থাকে। দুজন অফিসারের বিষয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে শাস্তি দিতে র্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য পোস্টিংয়ের আদেশ জারি করার পরেও তাদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে।
ইকবাল করিম বলেন, আমি জিয়াউলের সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করি। এটি কার্যকর করতে লজিস্টিক কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে দায়িত্ব দিই। পরে তিনি বিষয়টি তারেক সিদ্দিকীকে না জানানোয় তার বিরাগভাজন হন। একদিন মিলিটারি সেক্রেটারি অব প্রাইম মিনিস্টার মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবদিনের কাছ থেকে ফোন পাই। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জিয়াউলকে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ তুলে নিতে। আমি না বলেছি। আমাকে তখন জয়নুল জিজ্ঞাসা করেন, কোনো অফিসারকে অবাঞ্চিত করা বিশেষ পদক্ষেপ কি-না । আমি বলি হ্যাঁ, এটি একটি বিশেষ পদক্ষেপ। তুমি আদেশ অমান্য করলে তোমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে। দুদিন পর সংঘাত এড়াতে আমি নিজেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিই।