হোম > আইন-আদালত

গুলি লেগে আমার পায়ুপথ ছিঁড়ে যায়, থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিয়েও স্বাভাবিক হইনি

ট্রাইব্যুনালে জুলাইযোদ্ধা শাকিলের জবানবন্দি

স্টাফ রিপোর্টার

ফাইল ছবি

জুলাই বিপ্লবের উত্তাল মুহূর্তে পুলিশ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বর্বরতম হামলা ও গুলির মধ্যে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মিরপুর-১০ এ আন্দোলনে অংশ নেন অকুতোভয় জুলাইযোদ্ধা শাকিল আহমেদ। ওইদিন বিকেল ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের উপর বৃষ্টির মতো গুলি করছিল তারা। মুহুর্মুহু গুলিতে যখন চারপাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ছিলেন মুক্তিকামী মানুষ, ঠিক তখনই একটি গুলি এসে তার বাম নিতম্বের ভিতর দিয়ে ঢুকে ডান রানের গোড়া দিয়ে বেরিয়ে যায়। গুরুতর আহত হয়ে দেশে চিকিৎসার পর থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিয়েও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি শাকিল। ফ্যাসিবাদের নির্মমতার ক্ষতচিহ্ন নিয়ে মানবেতর জীবন পার করতে হচ্ছে তাকে।

রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ গুরুতর আহত জুলাইযোদ্ধা শাকিল আহমেদের জবানবন্দিতে এসব তথ্য ওঠে আসে।

জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে দ্বাদশ সাক্ষী জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দি শাকিল আহমেদ বলেন, আমার বর্তমান বয়স ২৩ বছর। আমি একজন ‘ক’ গেজেটভুক্ত আহত জুলাইযোদ্ধা। ২০২৪ সালে আমি শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে এইচ.এস.সি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলাম। রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত আবু সাঈদ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ১৮ জুলাই মিরপুর ১০ এ প্রথম আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। ১৯ জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর ফলপট্টির গলিতে গিয়ে হঠাৎ বিকট একটি শব্দ শুনতে পাই। তখন দেখি আমার ডান পাশে থাকা একজন আন্দোলনকারী রাস্তায় পড়ে গেছেন। তার শরীর দিয়ে অঝোরে রক্ত বের হচ্ছে। তার নাম মোক্তাকিন বিল্লাহ। মাথার একপাশ দিয়ে গুলি লেগে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। পরে জানতে পারি তিনি শহীদ হয়েছেন। ওই দিন আমার মাথায় একটা ছররা গুলি লাগে এবং একটু পরে আরেকটা ছররা গুলি এসে আমার ডান পায়ের হাঁটুতে লাগে। আমি সেখান থেকে বাসায় চলে যাই এবং বাসায় ১ আগস্ট পর্যন্ত বেড রেস্টে থাকি। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আমি আন্দোলনের খবর পাচ্ছিলাম না।

জবানবন্দিতে জুলাইযোদ্ধা শাকিল বলেন, ২ আগস্ট আমি আবার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। ৩ আগস্ট মিরপুর ১০ এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। ওইদিন আমরা শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিয়েছিলাম। ৪ আগস্ট আমি আবার আন্দোলনে যাওয়ার জন্য আম্মুর অনুমতি চাই। আম্মু আমাকে নিষেধ করলে আমি তাকে বলি ঢাকায় হত্যা করা হচ্ছে না, চট্টগ্রামে হচ্ছে। এ কথা বলে আম্মুকে বুঝিয়ে আমি আনুমানিক বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে মিরপুর-১০ এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। সেখানে দেখতে পাই যে, পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজন আন্দোলনকারীদের উপর বৃষ্টির মতো গুলি করছে। প্রতি দশ সেকেন্ড পরপর একেকজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাচ্ছে। আমি মিরপুর ১০ নম্বরে ফুটপাতে থাকা হকারদের একটি খাটের নিচে লুকাই। তখন একটি বিকট আওয়াজ শুনতে পাই এবং পিছন ফিরে দেখতে পাই একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেছে। দুজন আন্দোলনকারী তার কাছে আসে এবং আমিও তাকে ধরার জন্য খাটের নিচ থেকে বের হয়ে দাঁড়ালে একটি গুলি এসে বাম নিতম্বের ভিতর দিয়ে ঢুকে পেটের ভিতর ডান রানের গোড়া দিয়ে বের হয়ে যায়। এ সময় সাক্ষী তার গুলির ক্ষতস্থানসমূহ ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেন। গুলিটি আমার নিতম্বের ভিতর দিয়ে ঢুকে আমার পায়খানার রাস্তা ছিঁড়ে মাংসসহ বের হয়ে যায়।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, এরপর ২-৩ জন আন্দোলনকারী আমাকে ধরে। আমার মনে হচ্ছিলো আমি যদি এখন মরে যাই তবে পুলিশ আমার লাশ গুম করে ফেলবে। একথা ভেবে আমার আম্মুর নম্বরটা আমি তাদেরকে বলে দেই। আমি ২-৩ বার কালেমা পড়ি এবং এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আলোক হাসপাতালে নেওয়ার পর আমি ভাসাভাসা শুনতে পাই যে, ডাক্তাররা আমাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলছে। এরপর আমাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাকে যারা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়েছেন তাদের একজন আমার বাসায় ফোন করে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা জানায়। সেখানে ডাক্তার আমার ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে পরের দিন অপারেশন হবে বলে জানায়। ওইদিন সন্ধ্যায় ছাত্রলীগ, যুবলীগের ৭-৮ জন সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র অবস্থায় হাসপাতালে ঢুকে আমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য উদ্যত হয়। তখন আমার পরিবারের লোকজন ও হাসপাতালের নার্সরা তাদের হাতেপায়ে ধরে আমাদেরকে রক্ষা করে। তারা তাদেরকে বলে আমরা আন্দোলনকারী না।

জবানবন্দিতে এই জুলাইযোদ্ধা আরও বলেন, পরদিন ৫ আগস্ট ক্ষতস্থানের ব্যান্ডেজ খুলে ডাক্তাররা বুঝতে পারে ওখানে আমার অপারেশন করা সম্ভব নয়। তারা আমাকে হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। তখন খবর পাই যে, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে। অনেক লোকজন রাস্তায় নেমে গেছে। পরে আমাকে কল্যাণপুর ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হলে ৮ আগস্ট আমার অপারেশন হয়। সেখানে প্রথমে অপারেশন করে আমার পায়খানার বিকল্প রাস্তা তৈরি করা হয়। ইবনে সিনা হাসপাতালে আরও চার বার অপারেশন করা হয়। তারপর আমাকে পিজি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে আমি ছয় মাস থাকার পর ডাক্তারদের পরামর্শে আমাকে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। সেখানে ছয় মাসে আমার সর্বমোট নয় বার অপারেশন হয়। থাইল্যান্ডে চিকিৎসার পরেও আমার বাথরুমের রাস্তা স্বাভাবিক হয়নি। আমার পায়খানার রাস্তা সংকুচিত হয়ে গেছে। প্রতিদিন ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে আমাকে পায়খানা করতে হয়। আমার ডান পায়ের মেইন আর্টারি নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে লাইগেশন করে দেওয়া হয়েছে। আমাকে মিষ্টি জাতীয় খাবার খেতে নিষেধ করা হয়েছে। মিষ্টি জাতীয় খাবার খেয়ে ডায়াবেটিস হলে আমার পা কেটে ফেলতে হবে বলে ডাক্তাররা জানিয়েছে। আমি শক্ত খাবার খেতে পারি না।

জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর পরবর্তী সময়ে মিডিয়ার মাধ্যমে (বিশেষ করে বিবিসি) জানতে পারি এই কারফিউয়ের পিছনে মূল হোতা ছিলেন সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হক। আমি আরও জানতে পারি সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হকের একটি অডিও ভাইরাল হয়। এতে শুনতে পাই একজন আরেকজনকে বলছেন, কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদেরকে শেষ করে দিতে হবে। এই দুইজন ছিল শেখ হাসিনার কু-পরামর্শদাতা। এদের কুপরামর্শে শেখ হাসিনা কারফিউ দিতে রাজি হয়। এই কারফিউয়ের কারণে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালাতে সাহস পায়। আমি আমার এই অবস্থার জন্য এবং আন্দোলনে যে সমস্ত ব্যক্তিদের নিহত ও আহত করার হয়, তার জন্য সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হককে দায়ী করি। আমি তাদের বিচার চাই এবং আমার যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাই।

এক্সপ্রেসওয়েতে লাশ: সুপারভাইজার-হেলপারের দায় স্বীকার, চালক রিমান্ডে

সাবেক সেনাপ্রধান আজিজের সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ে কর্মকর্তা নিয়োগ দুদকের

রিয়াজুল হত্যা: হাসিনাসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের চার্জশিট

দুই মামলায় জামিন পেলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস

আওয়ামী লীগ আমলের ২৫১ গুমের তদন্ত শেষে এ বছরই বিচার শুরু

খাদেম রহমত আলী হত্যায় ২ জেএমবি সদস্যের মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ৫

চলতি মাসেই রায় হতে যাচ্ছে দুই মামলার

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সরকার-বিরোধীদল ব্যর্থ: তাজুল ইসলাম

নারী নির্যাতন মামলায় পিডিবির সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর স্ত্রী ও ছেলে কারাগারে

একাধিক বিয়ের তথ্য গোপন করায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর মামলা