টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ
দেশের সরকারি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে শিক্ষক সংকট। গুরুতর এই সমস্যার সমাধান না করেই নতুন করে আরো একটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, আগামীকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি সভায় (একনেক) ২৮৫ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘গাজীপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক কারখানাবহুল গাজীপুরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করা এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি। প্রতি বছর এখান থেকে ১২০ জন ছাত্রছাত্রী বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বের হবেন বলে জানানো হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবনায়।
সূত্র জানিয়েছে, অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ‘গাজীপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ প্রকল্পের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হবে ল্যাবসামগ্রী কেনাকাটায়। ২১৪ সেট ল্যাবসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় ব্যয় হবে ৩৩ কোটি টাকার বেশি। এটি মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হবে জমি অধিগ্রহণে। ৬ দশমিক ৫ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এটি মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) অধীনে থাকা ১১টি সরকারি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে রয়েছে শিক্ষকের তীব্র সংকট। যেখানে শিক্ষক প্রয়োজন ৬৩০ জন, সেখানে বিদ্যমান কলেজগুলোতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৮১ জন। শিক্ষকের এত ঘাটতি নিয়েই নতুন করে গাজীপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতে, প্রতিটি কলেজে ৭০টি শিক্ষক পদ থাকা প্রয়োজন, কিন্তু বিদ্যমান ৯টি কলেজে মোট ৬৩০টি পদের বিপরীতে মাত্র ২৭১টি পদ অনুমোদিত এবং কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ৮১ জন।
কিছু কলেজে এই সংকট আরো প্রকট। বিশেষ করে, জামালপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে মাত্র তিনজন শিক্ষক রয়েছেন, আর গোপালগঞ্জের শেখ রেহানা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ৩৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র আটজন শিক্ষক কর্মরত আছেন। ভোলা টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটেও ২০ জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ৩ জন কর্মরত রয়েছেন। শিক্ষক সংকটের কারণে ব্যবহারিক শিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকটের মূল কারণ হলো বস্ত্র অধিদপ্তরের ২০১৪ সালের ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ বিধি। এই বিধির কারণে নতুন কলেজগুলোতে, যেমন রংপুর, গোপালগঞ্জ ও জামালপুরে কোনো স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পুরোনো কলেজগুলো থেকে সংযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক এনে কাজ চালানো হচ্ছে, যা পুরোনো কলেজগুলোতেও সংকট আরো তীব্র করে তুলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী আমার দেশকে জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় অনেক সময় অতিথি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস করানো হয়। অতিথি শিক্ষকরা দ্রুত কোর্স শেষ করে চলে যান, ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। তাদের শিক্ষার মান তলানিতে নেমে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তীব্র শিক্ষক সংকটের সমাধান না হওয়ার আগে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষক সংকট রয়েছে। এ সংকট তৈরি হয়েছে সঠিক নিয়োগবিধি না থাকার কারণে। ৫০৯টি পদ আছে, যেটি নিয়োগবিধিতে নেই। জনপ্রশাসনের সঙ্গে প্রতিদিনই এ নিয়ে মিটিং হচ্ছে। খুব দ্রুতই হয়ে যাবে। নিয়োগ বিধির খসড়া জানুয়ারিতেই আমরা জনপ্রশাসনে পাঠিয়েছিলাম।’
শহিদুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আমি দ্রুত সমাধান চেয়েছিলাম। তখন জনপ্রশাসন সচিব বলেছিলেন ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে আমরা বিষয়টি সমাধান করব। তবে আমরা আশা করছিÑ এ মাসের মধ্যেই এ নিয়োগবিধি কেবিনেটে উত্থাপিত হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুরের এ টেক্সটাইল কলেজটির প্রস্তাব করা হয়েছিল শেখ হাসিনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নামে। কিন্তু পটপরিবর্তনের পর এটির নাম প্রস্তাব করা হয়েছে গাজীপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে।
গাজীপুরের মতো জায়গায় কলেজটির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শহিদুল ইসলাম বলেন, এ কলেজটির প্রয়োজনীয়তা খুবই বেশি। এর আগে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের যে কলেজগুলো হয়েছে, সেগুলো বেশির ভাগই জায়গামতো হয়নি। বিশেষ করে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদীর মতো টেক্সটাইল হাবগুলোতে হয়নি। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো আছে ঝিনাইদহ, বরিশালের মতো জায়গায়। সে বিবেচনায় এ কলেজটি হবে দরকারি জায়গায়।