দুর্বল পাঠদান, স্কুল নেতৃত্বের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, জলবায়ুজনিত বিঘ্ন ও কম অর্থায়নের কারণে এখনো দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা নাজুক। বিশ্বব্যাংকের চলতি বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে প্রাথমিক শিক্ষার সেই ভঙ্গুরতার চিত্র।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে চালু আছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আকারের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা, তবে এর ভঙ্গুরতাও তীব্র; ১০ বছর বয়সি শিশুদের ৫১ শতাংশই তাদের বয়স উপযোগী সাধারণ বাংলা ও ইংরেজি লেখা পড়তে ও বুঝতে পারে না, পাশাপাশি শ্রেণি উপযোগী গাণিতিক দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না তারা। বর্তমানে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮।
বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ২ কোটির বেশি শিশু, যার মধ্যে সরকারি ৬৫ হাজার ৫৬৭টি বিদ্যালয়ে পড়ে ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জন; ৫২.৬০ শতাংশ। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের চলতি বছরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই দশকে সর্বজনীন সুযোগ সৃষ্টি ও জেন্ডার সমতায় অগ্রগতি হলেও শ্রেণি উপযোগী দক্ষতা নিশ্চিতে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে, যার পেছনে দুর্বল পাঠদান, স্কুল নেতৃত্বের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, জলবায়ুজনিত বিঘ্ন ও কম অর্থায়ন চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি। তিনি বলেন, আমার মনে হয়েছে বিশ্বব্যাংক নির্দিষ্ট কিছু এলাকার চিত্রকে সামগ্রিকভাবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছে। কেননা, অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আগের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষার অনেক উন্নতি হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যে দেশে প্রধান শিক্ষকের ৬৫ হাজার ৫৫৩ পদের মধ্যে ২৭ হাজার ৭৩৪টিই শূন্য, যেখানে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত ১৩ আগস্ট এক মতবিনিময় সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
নেপের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষক নিজেদের ডিজিটালি দক্ষ দাবি করলেও বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে তা প্রয়োগ করতে পারেন মাত্র এক-চতুর্থাংশ।
জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের তথ্য আরো উদ্বেগজনক; ২০১১ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে বাংলায় দক্ষ ছিল ৬৭ শতাংশ, ২০২২ সালে তা নেমেছে ৫১ শতাংশে; গণিতেও ৫০ থেকে নেমেছে ৩৯ শতাংশে। অথচ এই সময়ে পিইডিপি-৩ ও ৪ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রস্তাবিত ৪১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকার পিইডিপি-৫ প্রকল্প এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়, যাতে ইউনিফর্ম-ব্যাগ-জুতা প্রদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ১৫ হাজার ৬৪১টি শ্রেণিকক্ষ ও ১,৫০০ ওয়াশ ব্লক নির্মাণসহ আটটি লক্ষ্য রয়েছে।
শিক্ষা অধিকার সংসদের সদস্য সচিব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, দক্ষ-মেধাবী শিক্ষক ও যথাযথ পাঠদান ছাড়া নতুন কারিকুলাম তেমন ফল দেবে না, এজন্য প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার এবং স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীও স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের দাবি জানান।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘২০২৮ শিক্ষাবর্ষের কারিকুলামে ব্যাপক ও বিস্তৃত সংস্কার আনা হচ্ছে। এতে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় দেশে একটি টেকসই ও যুগান্তকারী শিক্ষাক্রম রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব হবে।’ তিনি জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চারটি নতুন বই ও বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও শারীরিক শিক্ষাভিত্তিক বই ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং ‘টেকনিক্যাল এডুকেশন’ পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো রোবোটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ পদ্ধতি ও ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি চালু হচ্ছে, ক্রীড়া-সংস্কৃতিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে; ইতোমধ্যে ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়েছে এবং চতুর্থ শ্রেণি থেকে ক্রীড়া-সংস্কৃতির নতুন দুটি বই যুক্ত হচ্ছে।
এছাড়া আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রাথমিক শিক্ষার পরিবর্তনে যে স্বপ্ন ও দায়িত্ব আমাদের দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে সরকার সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দৃশ্যমান ও গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।