তুরস্কের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা
উচ্চশিক্ষা একটি জাতির টেকসই উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ ও উদ্ভাবনক্ষম অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক চালিকাশক্তি। এটি শুধু দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ায় না, বরং মৌলিক ও উচ্চতর গবেষণা, সাংস্কৃতিক পরিমার্জন এবং সচেতন ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক গঠনের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও আন্তর্জাতিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, সেখানে একটি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবনভিত্তিক উচ্চশিক্ষা কাঠামো গঠন করা যেকোনো জাতির জন্য অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তুরস্ক তার শিক্ষাকাঠামোয় সময়োপযোগী সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি জ্ঞাননির্ভর এবং প্রযুক্তি-সহায়ক সমাজ প্রতিষ্ঠায় যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা বাংলাদেশসহ অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য একটি অনুকরণযোগ্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তুরস্কের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গোড়াপত্তন ওসমানীয় যুগের মাদরাসাভিত্তিক ধর্মীয় শিক্ষায় হলেও উনিশ শতকের তানজিমাত সংস্কার, প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতাবাদী উদ্যোগ এবং ১৯৮১ সালে ‘Yükseköğretim Kurulu’ (YÖK) গঠনের মাধ্যমে শিক্ষাকাঠামোয় যে পরিবর্তন সাধিত হয়, তা আজকের তুরস্ককে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। ‘Teknopark’, ‘Araştırma ve Geliştirme (Ar-Ge) Merkezleri’ ও ‘İnovasyon Hubları’-এর মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণাভিত্তিক অর্থনীতি ও উদ্ভাবনমুখী সমাজ গঠনে সক্রিয় অংশীদারে পরিণত করা হয়েছে। এ ছাড়া Türkiye Scholarships, Diyanet Foundation, Erasmus+ ও Mevlana প্রোগ্রামের মাধ্যমে তুরস্ক একটি বৈশ্বিক শিক্ষাগন্তব্য হিসেবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত বর্তমানে কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন, যেমন পাঠ্যপুস্তকনির্ভরতা, গবেষণার অভাব, রাজনৈতিক সমস্যা, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমিত সুযোগ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তুরস্কের উচ্চশিক্ষার গতিশীল অভিজ্ঞতা একটি কৌশলগত পথনির্দেশ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিকীকরণে তুরস্কের উচ্চশিক্ষা : এক নতুন দিগন্ত
গবেষণা ও উদ্ভাবনে অগ্রগতি
তুরস্কের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করেছে। দেশের প্রধান জাতীয় গবেষণা সংস্থা TÜBİTAK (Türkiye Bilimsel ve Teknolojik Araştırma Kurumu) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্রগুলো সম্মিলিতভাবে গবেষণা পরিবেশ সৃষ্টি, গবেষণার তহবিল প্রদান ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করছে। বর্তমানে তুরস্ক তার জিডিপির ১ দশমিক ০৯ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করছে, যা উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা প্রতিবছর হাজার হাজার গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশ করছে। QS World University Rankings ও Times Higher Education Rankings-এ তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি দেশটিকে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
বিষয়ভিত্তিক গবেষণায় তুরস্কের প্রধান অগ্রগতি
তুরস্ক বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য গবেষণা ও উদ্ভাবনের অগ্রগতি সাধন করেছে, যা আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসিত হচ্ছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কিছু ক্ষেত্র হলো—
১. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা প্রযুক্তি : কোভিড-১৯ মহামারির সময় তুরস্ক নিজস্ব ভ্যাকসিন Turkovac উদ্ভাবন করে আন্তর্জাতিক প্রশংসা অর্জন করেছে। পাশাপাশি দেশটি চিকিৎসা প্রযুক্তি ও উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখিয়েছে। তুরস্কের চিকিৎসা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাপী এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে টেলিমেডিসিন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক ডিজিটাল ইনোভেশন নিয়ে গবেষণায়।
২. প্রযুক্তি ও রোবোটিক্স : Selçuk University ও Karabük University-তে রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সম্পর্কিত গবেষণার অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তুরস্ক এখন রোবোটিক্স, মেশিন লার্নিং ও অটোমেশন প্রযুক্তিতে বেশ কিছু পেটেন্টের মালিক, যা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সৃষ্টি করছে।
৩. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা : তুরস্কের বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি, জৈব সার ও খামার-উৎপাদন ব্যবস্থায় অগ্রগতি সাধন করছে। দেশটি কৃষি ক্ষেত্রের আধুনিকীকরণের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, যেখানে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া তুরস্কের কৃষি গবেষণা কেন্দ্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক খাদ্য সংকট মোকাবিলায় গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
৪. ইসলামিক অর্থনীতি ও ফিন্যান্স : তুরস্ক ইসলামিক অর্থনীতি ও ফিন্যান্সের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে সুদবিহীন ব্যাংকিং, ওয়াক্ফভিত্তিক অর্থনীতি ও জাকাত ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক একাডেমিক গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। তুরস্কে নতুন ডিজিটাল ইসলামিক ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপরও গবেষণা হচ্ছে, যা ইসলামি অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরো আধুনিক ও কার্যকর করতে সাহায্য করবে।
এই অগ্রগতি তুরস্কের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হয়েছে এবং এটি দেশটিকে বৈশ্বিক উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামি শিক্ষায় অগ্রগতি
তুরস্কে ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মতত্ত্বচর্চার জন্য অসংখ্য স্বনামধন্য ফ্যাকাল্টি ও ইনস্টিটিউট রয়েছে। যেমন Marmara Üniversitesi, Ankara Üniversitesi İlahiyat Fakültesi, Sakarya Üniversitesi İlahiyat Fakültesi প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান আধুনিক ও ঐতিহ্যভিত্তিক ইসলামি জ্ঞানচর্চার সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানের পাঠক্রম পরিচালনা করে।
এ ছাড়া গবেষণাকেন্দ্রিক থিসিস প্রোগ্রাম, ফিকহ, কালাম, তাফসির, হাদিস, ইসলামি দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের আন্তঃধর্মীয় সংলাপভিত্তিক গবেষণারও এখন ব্যাপক প্রসার রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ইসলাম ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, মানবাধিকার, নারীর অধিকার, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্কভিত্তিক পাঠদান চালু করেছে।
নিচের অনুচ্ছেদটি আরো সংক্ষিপ্ত, প্রাঞ্জল ও একাডেমিকভাবে শুদ্ধ করে উপস্থাপন করা হলো—
শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নয়ন ও একাডেমিক কাঠামো
তুরস্কের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার (YÖK) অধীনে পরিচালিত হয়, যা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান করে। শিক্ষাবর্ষ দুটি সেমিস্টারে বিভক্ত এবং শিক্ষার্থীরা অনলাইনের মাধ্যমে কোর্স নির্বাচন করে থাকে। স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক বিভাজনের পরিবর্তে অনুষদভিত্তিক কাঠামো অনুসরণ করা হয়, যাতে তারা মৌলিক জ্ঞান অর্জন করতে পারে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তারা তাদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী বিশেষায়িত বিষয়ে অধ্যয়ন করে।
ভাষাগত যোগ্যতা না থাকলে শিক্ষার্থীদের এক বছরের ভাষা কোর্সে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। একাডেমিক ক্যারিয়ার গড়তে ইচ্ছুকদের থিসিসসহ স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করতে হয়। শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডি ডিগ্রির পাশাপাশি স্বীকৃত পিয়ার-রিভিউড জার্নালে অন্তত পাঁচটি গবেষণা প্রবন্ধ থাকা আবশ্যক। পদোন্নতি নির্ভর করে গবেষণা, গ্রন্থ রচনা, একাডেমিক পেপার উপস্থাপন ও একাডেমিক মূল্যায়নের ওপর।
এই কাঠামোর মাধ্যমে তুরস্ক ধাপে ধাপে একটি মানসম্মত ও টেকসই উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যা অন্য দেশগুলোর জন্য অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে।
আন্তর্জাতিকীকরণ পলিসি
বর্তমানে তুরস্কে ৩ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত, যা দেশটিকে একটি বৈশ্বিক শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত করেছে। সরকারি Türkiye Scholarships, IsDB, Diyanet Foundation Scholarships প্রভৃতি প্রোগ্রামের আওতায় শত শত শিক্ষার্থী স্নাতক থেকে পিএইচডি পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছে।
Mevlana, Farabi, Erasmus+ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০টি সরকারি ও ১০০টির অধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু রয়েছে। তবে উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত সম্প্রসারণ ঘটলেও গুণগত মান, গবেষণার সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত; অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী নয় এবং শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সমন্বয় দুর্বল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল পর্যায়ের গবেষণার সুযোগ সীমিত এবং গবেষণাভিত্তিক যোগ্য শিক্ষকের অভাব প্রকট। এ কারণে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই এখনো শীর্ষ এক হাজারের মধ্যে স্থান করে নিতে পারেনি।
এ অবস্থার জন্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নয়, বরং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নীতিনির্ধারণ ও গুণগত তদারকির ক্ষেত্রে UGC অনেক সময় নিষ্ক্রিয় থেকেছে বা রাজনৈতিক প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক পদায়ন ও প্রকল্প অনুমোদনে দলীয় আনুগত্য, আঞ্চলিক পক্ষপাত ও স্বজনপ্রীতির প্রবণতা উচ্চশিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও গবেষণার মাপকাঠিকে পাস কাটিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব, ছাত্র সংগঠনের সহিংসতা এবং একাডেমিক পরিবেশে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, যা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার সমাধানে শিক্ষা ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, গবেষণাভিত্তিক ও স্বচ্ছতাপূর্ণ একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি UGC-কে একটি সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তর করা জরুরি।
তুরস্কের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত প্রস্তাবনা
১. একক ও শক্তিশালী নীতিনির্ধারক সংস্থা গঠন
তুরস্কের YÖK (Yükseköğretim Kurulu)-এর আদলে UGC-কে একটি স্বায়ত্তশাসিত, গবেষণাভিত্তিক ও অরাজনৈতিক উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বানানো জরুরি, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাননিরীক্ষা, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, গবেষণা মূল্যায়ন এবং নিয়োগ ও স্বীকৃতি প্রদান-সংক্রান্ত মূল নীতিনির্ধারক হবে।
২. গবেষণা তহবিল ও নীতিনির্ধারণী গবেষণা কেন্দ্র (পলিসি থিংক ট্যাঙ্ক)
TÜBİTAK (Türkiye Bilimsel ve Teknolojik Araştırma Kurumu)-এর মডেল অনুসরণ করে একটি জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থা গঠন করা প্রয়োজন, যা—
৩. পিএইচডি ও পোস্টডক শিক্ষা
৪. গবেষক শিক্ষক নিয়োগ ও মানোন্নয়ন
৫. উদ্ভাবনী গবেষণার সঙ্গে শিল্প ও প্রযুক্তির সংযোগ
৬. শিক্ষার মানোন্নয়নে করণীয়
৮. প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশনা ও জার্নাল উন্নয়ন
এই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নয়নশীল দেশ তার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে তুরস্কের মডেল অনুসরণে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, গবেষণাভিত্তিক ও উদ্ভাবননির্ভর কাঠামোয় রূপান্তর করতে সক্ষম হবে। এতে জাতীয় সক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বিশ্বমঞ্চে একাডেমিক ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে।
উপসংহার
তুরস্কের উচ্চশিক্ষা কাঠামো বিগত দুই দশকে একটি সুসংগঠিত, গবেষণাভিত্তিক ও নীতিনির্ধারক কেন্দ্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে একটি আদর্শ ও গ্লোবাল মডেলে পরিণত হয়েছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি, ইংরেজি ভাষাভিত্তিক পাঠ্যক্রমের বিস্তার এবং উচ্চমানসম্পন্ন গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশে বাধ্যবাধকতা—এসবই একে একটি বৈশ্বিক শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বিশেষভাবে TÜBİTAK, YÖK এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইনকিউবেটর ও প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলো শিক্ষার সঙ্গে শিল্প ও উন্নয়নকে সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এ অভিজ্ঞতা একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একাডেমিক পরিবেশ, যোগ্য ও গবেষণানির্ভর শিক্ষকের নিয়োগ, পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল পর্যায়ে গবেষণার সম্প্রসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা। উচ্চশিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, গবেষণার জন্য স্বতন্ত্র তহবিল বরাদ্দ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা জরুরি। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা যদি এই কাঠামোগত সংস্কার ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে তুরস্কের মডেল বাস্তবায়ন শুধু সম্ভাব্যই নয়, বরং একটি কার্যকর ও টেকসই রূপান্তরের পথপ্রদর্শক হতে পারে।