বাংলাদেশে বেসরকারি মাদরাসা শিক্ষা কারিকুলামে সংস্কার ও উন্নয়ন আন্দোলনের বাস্তব নমুনাস্বরূপ এই জামেয়া প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বিগত শতাব্দীর আলোড়ন সৃষ্টিকারী মহান ব্যক্তিত্ব, ইসলামি দাওয়াতের অগ্রনায়ক, বিশ্ববরেণ্য ইসলামিক চিন্তাবিদ আল্লামা সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)-এর দিকনির্দেশনায় বরেণ্য ইসলামি শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী বাংলাদেশে এ শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের পতাকা উত্তোলন করেন।
আকিদা-বিশ্বাস ও আমল-আখলাকসহ ইসলামের মৌলিক শিক্ষা-দীক্ষা অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োজনীয় আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ‘কল্যাণকর পুরাতন ও উপকারী নতুনের সমন্বয় সাধন’ করে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কারিকুলাম প্রণীত হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে দীর্ঘকাল ধরে দ্বীনি মাদরাসাগুলোয় চিন্তার যে জড়তা ও স্থবিরতা বিরাজ করছিল, তা নিরসন করা এবং যুগচাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এমন একদল সুযোগ্য দা’ঈ ইলাল্লাহ তৈরি করা, যারা শিক্ষা-দীক্ষার পাশাপাশি দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে সক্ষম হবেন।
আকিদা ও কর্মপদ্ধতি
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা-বিশ্বাস লালন করে আসছে এবং সর্বক্ষেত্রে সালফে সালেহিনের পথনির্দেশনা অনুসরণ করে চলেছে।
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক
বরেণ্য ইসলামি চিন্তাবিদ ও বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষাসংস্কার আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা আরবি সাহিত্যিক আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী রাহিমাহুল্লাহ।
বিংশ শতাব্দীর বিশ্ববরেণ্য ইসলামি চিন্তাবিদ আল্লামা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)-এর পরামর্শ ও নির্দেশনাক্রমে ১৪০৫ হিজরি, মোতাবেক ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমান মহাপরিচালক
শিক্ষা সংস্কারের পুরোধা ব্যক্তিত্ব আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী (রহ.)-এর একান্ত সহচর ও আস্থাভাজন। প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে যিনি ছিলেন যওক নদভী (রহ.)-এর ছায়াসঙ্গী, আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কাওমিয়্যার স্থায়ী কমিটির সদস্য, দেশের প্রবীণ আলেম লেখক, মাসিক আল হকের প্রধান সম্পাদক আল্লামা মুহাম্মদ ফুরকানুল্লাহ খলীল হাফিজাহুল্লাহ।
শিক্ষক প্যানেল
৫৫ জন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সৌদি আরবসহ আরব বিশ্ব ও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্ত।
ছাত্র সংখ্যা
প্রায় দুই হাজার জন। এর মধ্যে ৭০০ ছাত্রের পূর্ণ খরচ জামেয়া বহন করে।
শিক্ষাস্তরগুলো : ১. জামেইয়্যাহ (স্নাতক) আরবি ভাষা ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ৪ বছর, ২. ছানভিয়্যাহ (উচ্চমাধ্যমিক) স্তর, ৩ বছর, ৩. ইদাদিয়্যাহ (নিম্নমাধ্যমিক) স্তর, ৩ বছর, ৪. ইবতেদাইয়্যাহ (প্রাথমিক) স্তর, ৫ বছর, ৫. কিন্ডারগার্টেন, ৬. তা’হীলী (প্রস্তুতি ক্লাস); হিফজ সমাপনকারী ছাত্রদের প্রাথমিক স্তরের প্রথম চার ক্লাস একসঙ্গে পড়ানোর ব্যবস্থা।
বিশেষায়িত বিভাগগুলো
১. শো’বা (আরবি ভাষা কোর্স); সরকারি ও বেসরকারি মাদরাসায় শিক্ষাসমাপনকারী ছাত্রদের আরবি ভাষা শিক্ষার বিশেষ কোর্স (২ বছর)।
২. দাওরায়ে হাদিস, ৩. উচ্চতর ফিকহ ও ফতোয়া বিভাগ, ৪. হিফজ বিভাগ, ৫. ডিপ্লোমা ইন মিডিয়া স্টাডিজ (প্রস্তাবিত)
সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
জামেয়ায় ছাত্রদের বিশেষ কিছু সাংস্কৃতিক কর্মতৎপরতা আছে, যা সাহিত্য ও সংস্কৃতি ফোরাম ‘আন্নাদী আস সাকাফী আল-ইসলামী’র তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এ সংগঠনটি ছাত্রদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করে থাকে।
উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
:: আরবি, বাংলা ও ইংরেজি তিন ভাষায় মাসিক ও সাপ্তাহিক বক্তৃতা অনুষ্ঠান।
:: বিভিন্ন উপলক্ষে জ্ঞানগর্ভ তথ্যবহুল প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা।
:: সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা; প্রতি শিক্ষাবর্ষে দুটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
:: সাহিত্য আসর, কবিতা চর্চা ও শিক্ষা সফরের আয়োজন।
:: চার ভাষায় স্তর ও ক্লাসভিত্তিক মাসিক দেয়ালিকা প্রকাশ।
ছাত্রদের জন্য সুযোগ-সুবিধা
তালিবে ইলমদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও যথাযথ বিকাশের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই জামেয়া করে থাকে। এর মধ্যে আবাসন, খাওয়া-দাওয়া ও সুস্থ বিনোদনের নিমিত্তে সীমাবদ্ধ খেলাধুলা অন্যতম।
# আবাসন সুবিধা
ছাত্ররা ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করার পর জামেয়ার হোস্টেলে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকার সুযোগ লাভ করে। আবাসিক হোস্টেলের সার্বিক দেখাশোনার জন্য প্রচুর ক্ষমতাসম্পন্ন দারুল ইকামা তথা হোস্টেল নিয়ন্ত্রণ কমিটি রয়েছে। এ কমিটিই ছাত্রদের চলাফেরা ও আচার-আচরণগত দিকটি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্রয়োজনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থাও করে এ কমিটি।
# খাওয়া-দাওয়া
আবাসিক ছাত্রদের জন্য নামমাত্র মূল্যে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করে জামেয়া কর্তৃপক্ষ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার নিমিত্তে সব ছাত্র সম্মিলিতভাবে খাওয়া-দাওয়া করার জন্য রয়েছে একটি সুপরিসর ক্যানটিন। মেধাবী গরিব ছাত্রদের জন্য ভালো রেজাল্টের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ ফ্রি বা এককালীন খোরাকির ব্যবস্থা করা হয়।
# সুস্থ বিনোদন
ছাত্রদের সুস্থ বিনোদন ও শরীর চর্চার জন্য প্রতিদিন বাদ আসর সীমিত পরিসরে বৈধ খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
জামেয়ার প্রকাশনা
আরবি ও ইসলামি সাহিত্যচর্চার সূতিকাগার হিসেবে জামেয়া থেকে আরবি এবং বাংলায় দুটি ইসলামি গবেষণা ও সাহিত্যবিষয়ক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। বাংলা ম্যাগাজিন ‘আল-হক’ প্রত্যেক মাসে এবং আরবি ম্যাগাজিন ‘মানারুশ-শারক’ সাহিত্য সাময়িকী হিসেবে প্রকাশিত হয়।
গবেষণা ও লাইব্রেরি
তিনতলার একটি লাইব্রেরি ভবন রয়েছে, যার নাম ‘মাকতাবাতু আল্লামা ড. ইউসুফ আল-কারাজাভি আল-আম্মা’
এটি বিপুলসংখ্যক প্রাচীন-আধুনিক কিতাবে সমৃদ্ধ।
এ ছাড়া সম্পূর্ণ ছাত্রদের পরিচালনায় ‘সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) ছাত্র পাঠাগার’ নামে একটি পাঠাগার রয়েছে। এতে প্রাচীন-আধুনিক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রায় চার হাজারের মতো বই রয়েছে।
তারবিয়াতি ব্যবস্থা
ছাত্র-শিক্ষক ও সাধারণ মুসল্লিদের ঈমান-আমল গঠনের নিমিত্তে প্রতিদিন বাদ আসর মসজিদে সম্মিলিতভাবে তালিম ও ফাজায়েলের আলোচনা হয়। প্রতি জুমাবার ইসলাহি বয়ানের ব্যবস্থা রয়েছে। দাওয়াতি ফিকির ও জজবা তৈরির লক্ষ্যে প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি ছাত্র সুযোগমতো জুমাবারের ছুটিকে কাজে লাগিয়ে মহল্লায় বা পাশের কোনো এলাকায় দাওয়াতি কাজে বের হয়ে থাকে। আর বিভিন্ন ছুটিতে বিভিন্ন মেয়াদে ছাত্ররা দাওয়াতের মিশন নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে জামেয়া কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে থাকে।
যেসব মহান ব্যক্তির আগমনে জামেয়া ধন্য হয়েছে
দেশ-বিদেশের বহুবরেণ্য ইসলামি ব্যক্তিত্ব, সরকারি-বেসরকারি দায়িত্বশীল, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী জামেয়া পরিদর্শন করেন, তাদের কয়েকজন হলেন
১. আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী আল-হাসানী নদভী (রহ.)
মহান ইসলামি চিন্তানায়ক, বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক ও দা’ঈ
২. জাস্টিস আল্লামা মুহাম্মদ ত্বাকী উসমানী
বিশ্ববরেণ্য ইসলামি আইনবিদ, সাবেক বিচারপতি ইসলামি শরিয়া কোর্ট, পাকিস্তান
৩. ড. আব্দুল্লাহ বিন উমর নসীফ
প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার, সৌদি আরব
৪. ড. মানে হাম্মাদ আল জুহানী (রহ.)
প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল, ওয়ার্ড অ্যাসেম্বলি অব মুসলিম ইয়ুথ (wamy)
৫). ড. হুসাইন বিন আব্দুল আযীয
পেশ মাম ও খতিব মসজিদে নববি, মদিনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব
৬. আল্লামা সাইয়েদ আনযার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) প্রথিতযশা মুহাদ্দিস, দারুল উলুম দেওবন্দ (ওয়াক্ফ)
৭. আল্লামা সাইয়েদ মুহাম্মদ রাবে হাসানী নদভী, চেয়ারম্যান আন্তর্জাতিক ইসলামি সাহিত্য সংস্থা ও রেক্টর দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ, ভারত
৮. ড. আব্দুল্লাহ বিন নাসের আল বুসাইরি
বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক সৌদি রাষ্ট্রদূত
৯. আল্লামা সাঈদ আহমদ পালনপুরী
শায়খুল হাদিস দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত
১০. আল্লামা জামিল আহমদ সাহেব
আশরাফুল হিদায়া রচয়িতা ও শাইখুল হাদিস দারুল উলুম দেওবন্দ (ওয়াক্ফ)
১১. মাওলানা কালীম সিদ্দিকী
প্রখ্যাত দা’ঈ ও মুবাল্লিগ
১২. মাওলানা তারিক জামিল
বিশ্ববরেণ্য দা’ঈ ও মুবাল্লিগ
জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল ইসলামিয়া সম্পর্কে বিশিষ্ট ব্যক্তির অভিমত
(আরব-অনারব বহুসংখ্যক প্রখ্যাত আলিম, সাহিত্যিক, চিন্তক ও দাঈ জামেয়া দারুল মা’আরিফের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ভিজিটরবুক থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের অভিমত তুলে ধরা হলো।)
১. বিংশ শতাব্দীর ভারতের নেতৃস্থানীয় ইসলামি পণ্ডিত, চিন্তাবিদ, লেখক, প্রচারক, সংস্কারক সাইয়্যিদ আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী (পরিদর্শন বইয়ে) লিখিত অংশের বঙ্গানুবাদ) :
‘বাংলাদেশের চট্টগ্রাম নগরীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামেয়া দারুল মা’আরিফ পরিদর্শন করেছি। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও দীক্ষাপদ্ধতি এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পর্কে অবহিত হয়েছি। এ প্রতিষ্ঠান তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক পদ্ধতিতে ইসলামি জ্ঞানগুলো ও আরবি ভাষা শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। এ ক্ষেত্রে তার গৃহীত পন্থাগুলো অত্যন্ত চমৎকার ও কার্যকর। স্বল্প সময়ে এ প্রতিষ্ঠান বিরাট ভূমিকা পালন করছে। আশা করছি, শিক্ষা ক্ষেত্রে এটি আরো ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। আরবি ও ইসলামি সাহিত্যে এটি হিন্দুস্তানের আলিম ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অত্র প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শাইখ সুলতান যওক নদভী আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী ভাই।’
২. পাকিস্তান ইসলামি কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি, বহু নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের প্রণেতা, দারুল উলুম করাচির শায়খুল হাদিস ও ফকিহ হজরত আল্লামা তাক্বী উসমানীর (পরিদর্শন বইয়ে) লিখিত অংশের অনুবাদ)
হামদ, দরুদ ও সালামের পর...
‘২৪ জুমাদাস সানি ১৪১১ হিজরিতে, চট্টগ্রামের দারুল মা’আরিফ আল ইসলামিয়া পরিদর্শনের সৌভাগ্য হয়। তিন বছর আগেও এ প্রতিষ্ঠানে আসার সুযোগ হয়েছিল। তখন ছিল অত্র প্রতিষ্ঠান সূচনালগ্নের কাছাকাছি সময়। আজ প্রত্যক্ষ করলাম এ প্রতিষ্ঠান তার লক্ষ্যপানে খুব দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও প্রচুর। তারা ইসলামি বিষয়াবলি ও আরবি ভাষা জ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করছে। ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে এ প্রতিষ্ঠান অধিকতর গুরুত্বারোপ করে থাকে। এখানে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের বিশেষ বিভাগও রয়েছে। এসব কিছু পরিচালিত হচ্ছে আমাদের বন্ধুবর সম্মানিত ভাই শাইখ মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভীর তত্ত্বাবধানেই। যাকে মহান আল্লাহ বহুমাত্রিক যোগ্যতা দিয়ে ধন্য করেছেন। এক ব্যক্তির মধ্যে এতগুলো যোগ্যতার সমাহার খুব কম লোকের মধ্যে হয়ে থাকে। আবাদিতে ভরপুর এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে তার বরকতময় প্রচেষ্টার বিষয়টি দেদীপ্যমান। যেকোনো দর্শক প্রতিষ্ঠানের সুরভিত পরিবেশে বহুমুখী সেবামূলক কার্যক্রম দেখলে তা উপলব্ধি করতে পারবেন। আরো অনুভব করতে পারবেন ছাত্র-শিক্ষকদের কথোপকথন এবং ছাত্রদের মাধ্যমে প্রকাশিত দেয়ালিকায় তাদের মানসম্মত লেখার মাধ্যমে।
আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি, তিনি যেন এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের তার সন্তুষ্টি ও মর্জিমাফিক সেবা দেওয়ার সুযোগ দান করেন। তিনি সর্বশ্রোতা ও কবুলকারী এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।’
৩. সৌদি আরবের প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মু’তামার আল আলামুল ইসলামির (ওয়ার্ল্ড ইসলামি কংগ্রেস) প্রধান ডক্টর আব্দুল্লাহ উমার নাসিফ লিখেছেনÑ
‘মহান আল্লাহর প্রতি অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, চমৎকার এ প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন ও এর অর্জনগুলো প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। স্বল্প সময়ে এ প্রতিষ্ঠানের ঈর্ষণীয় অগ্রগতি আমাকে সত্যিই আনন্দিত ও সৌভাগ্যবান করেছে। আল্লাহ দায়িত্বশীলদের উত্তম প্রতিদান দিয়ে ধন্য করুন। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় আমাদের প্রিয় বন্ধু শাইখ সুলতান যওক নদভীকে। এ প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সাফল্য কামনা করছি। আল্লাহ এর শিক্ষার্থী ও গ্র্যাজুয়াটদের আমলদার দ্বীনপ্রচারক ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে কবুল করুন। মহৎকর্ম ও বৃহত্তর অর্জনে এর ভবিষ্যৎ আরো উজ্জ্বল হোক!’
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া’র খ্যাতি-প্রসিদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুসলিম ও আরববিশ্বের বহু মনীষী দারুল মা’আরিফ পরিদর্শনে এসে ঈর্ষণীয় মন্তব্য করে গেছেন। অনুরূপ বেশ কিছু দেশের ইউনিভার্সিটি জামেয়ার একাডেমিক কারিকুলাম ও সনদকে Equivalency (সমতা) প্রদান করে। সেই সুবাদে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ, লক্ষ্ণৌর দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা, সৌদি আরবের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় (মদিনা মুনাওয়ারা), কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয় (রিয়াদ), ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (রিয়াদ), উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় (মক্কা মুকাররমা), লিবিয়ার কুল্লিয়াতুদ দাওয়া (ত্রিপলি) এবং সুদানের খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিতে দারুল মা’আরিফের বহু ছাত্র অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে দেশে ফিরে কিংবা বিদেশে ইলমি ও আমলি কর্মক্ষেত্রে সুনাম ও সম্মানের সঙ্গে কর্মরত আছেন এবং বর্তমানেও সেসব ইউনিভার্সিটিতে অনেক ছাত্র অধ্যয়নরত রয়েছেন।
তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানের সিলেবাসে বিমুগ্ধ হয়ে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সুদান, মালয়েশিয়া, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বেশ কিছু ছাত্র জামেয়ার বিভিন্ন স্তরে পড়ালেখা করেছে, যা বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাশিক্ষা ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়।
উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ও অর্জন
১. ইসলামি শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের গোড়াপত্তন ও যুগোপযোগী সিলেবাসে প্রণয়ন এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত করা। জামেয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কর্তৃক শিশু-কিশোরদের জন্য আরবি ভাষা শিক্ষার পাঠ্যবই প্রণয়ন।
২. উচ্চতর আরবি ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার আদর্শ ও অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি লাভ।
৩. আন্তর্জাতিক ইসলামি সাহিত্য সংস্থার বাংলাদেশ ব্যুরো অফিস এখানে অবস্থিত, যার ব্যুরোপ্রধান ছিলেন জামেয়ার সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী রহিমাহুল্লাহ। তার উদ্যোগ ও বাস্তবায়নে ১৯৯৪ সালে জামেয়া প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক ইসলামি সাহিত্য সেমিনার হয়। ওই ‘আন্তর্জাতিক ইসলামি সাহিত্য সেমিনার’-এ দেশবরেণ্য কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ৩১টি দেশের শতোর্ধ্ব নামি-দামি, প্রখ্যাত ব্যক্তি, আলেমে দ্বীন, সাহিত্যিক-সমালোচক ও শিক্ষাবিদদের পদচারণে মুখরিত হয়েছিল জামেয়া ক্যাম্পাস।
৪. সৌদি আরবের মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জামেয়ার সার্টিফিকেটের সমতা চুক্তি সম্পাদন। এর আওতায় ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিবছর জামেয়ার এক বা একাধিক ছাত্র উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপ লাভ করে আসছে। মদিনা ছাড়াও আরব বিশ্বের আরো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে জামেয়ার সন্তানরা অধ্যয়নরত আছে। তা ছাড়া ভারতের লক্ষ্ণৌর দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার সঙ্গেও শিক্ষাচুক্তি বিদ্যমান রয়েছে।
৫. ৩৫ বছর পূর্তিতে ২০২০ সালে প্রথম দস্তারবন্দি মাহফিল (সমাবর্তন) আয়োজন।
জাতীয় স্বার্থে জামেয়ার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী রহিমাহুল্লাহর নিঃস্বার্থ অবদান
(আল্লামা সুলতান যওক নদভী এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি সর্বদা ধর্মীয় ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং জাতীয় বিভিন্ন স্বার্থে তিনি ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন।)
শিক্ষা সংস্কারের ডাকে আল্লামা সুলতান যওক নদভী
পটিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতার সোনালি সময়ে আল্লামা সুলতান যওক নদভী (রহ) কী যেন এক অপূর্ণতা অনুভব করতেন। উপলব্ধি করতে পারলেন, বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলো শিক্ষক-ছাত্রদের ইখলাস, অক্লান্ত পরিশ্রম ও বিশাল ত্যাগ সত্ত্বেও যুগের চাহিদা পরিপূর্ণভাবে মেটাতে পারছে না। ছাত্ররা দীর্ঘ সময় আরবি সিলেবাস পড়েও আরবি ভাষা আয়ত্ত করতে না পারা তাকে পীড়া দিত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের জাতীয় ভাষা বাংলাবিমুখতা সমাজের শিক্ষিত শ্রেণির কাছে ইসলামকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন এবং জাতীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তবু মাদরাসাশিক্ষায় শিক্ষিত ও সাধারণ শিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যে এক বিশাল দূরত্বের দেয়াল তৈরি হয়ে আছে।
এভাবেই আল্লামা যওক নদভী (রহ.)-এর মনে শিক্ষা সংস্কারের বীজ অঙ্কুরিত হয়। তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন, দ্বীনি শিক্ষার মৌলিকত্ব বজায় রেখে এসব অসংগতি দূর করতেই হবে। দিন যত গড়িয়েছে, বিস্তৃত হয়েছে তার স্বপ্নের ডালপালা । জাতিকে তার স্বপ্নের জানান দেওয়ার লক্ষ্যে রচনা করেনÑ
‘মাদরাসাশিক্ষা সংস্কারের ডাক’ নামক ছোট্ট অথচ ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী পুস্তিকা।
কওমি মাদরাসার এক নিঃস্বার্থ অভিভাবক
আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী (রহ.)
শিক্ষা সংস্কারের ডাক দিয়ে আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও দেশের ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদরাসাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা দূরে থাক, কখনো দূরত্বও তৈরি হতে দেননি । ‘আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ’-এর আমৃত্যু সভাপতি এবং আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কাওমিয়্যা বাংলাদেশের স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। এর আগে সরকার কর্তৃক গঠিত কওমি মাদরাসাশিক্ষা কমিশনের অন্যতম সদস্য হিসেবে কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির নেপথ্য কারিগরদের একজন ছিলেন তিনি। কিন্তু কখনো নিজের কৃতিত্ব জাহির করেননি সদা প্রচারবিমুখ এই মহান মুরব্বি।
দ্বীনের স্বার্থে বজ্রকঠিন প্রতিবাদী ছিলেন
আল্লামা যাওক নদভী রহিমাহুল্লাহ
সাধারণত আল্লামা সুলতান যওক নদভী ছিলেন সদা শান্ত, গম্ভীর। তবে যুগে যুগে প্রকাশ পাওয়া ইসলাম ও নীতিনৈতিকতাবিরোধী বিভিন্ন ফেতনা মোকাবিলায় ছিলেন বজ্রকঠিন প্রতিবাদী। কাদিয়ানি ফেতনা মোকাবিলায় খতমে নবুওয়াত মুভমেন্ট বাংলাদেশের মহাসচিব দেশের আলেম-উলামা ও ইসলামপ্রিয় মুসলিম জনতাকে সংগঠিত করেন। তিনি ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। হেফাজতে ইসলাম এ নামটি তার নির্বাচন করা।
এ ছাড়া হাইকোর্ট কর্তৃক ফতোয়া নিষিদ্ধকরণ বিরোধী আন্দোলন, কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক নারী নীতিমালা প্রণয়নবিরোধী আন্দোলন এবং নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের সেই উত্তাল আন্দোলনগুলোর অগ্রসেনানী হিসেবে আল্লামা যওক নদভীর প্রতিবাদী বজ্রকণ্ঠ জাতি যুগ যুগ ধরে স্মরণ রাখবে।
আরবি ও ইসলামি সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় যওক নদভী (রহ.)
বাংলাদেশে আরবি ও ইসলামি সাহিত্যের প্রাণপুরুষ হিসেবে আল্লামা যওক নদভীর গ্রহণযোগ্যতা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বদরবারে সমাদৃত। তাই তো সৌদি আরবভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামি সাহিত্য সংস্থার ট্রাস্টি এবং বাংলাদেশ ব্যুরো চিফ ছিলেন আমৃত্যু। ওই সংস্থার তত্ত্বাবধানে মাসিক আল হক নামের বাংলা মাসিক পত্রিকা ও মানারুশ শারক নামের আরবি সাময়িকী হজরতের অমর কীর্তিগুলোর একটি।
আল্লামা যাওক নদভীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা
বাংলাদেশে বসবাস করেও তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। কখনো উম্মাহর ক্রান্তিকালে সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের বৈশ্বিক স্কলার সম্মেলনে, কখনো আন্তর্জাতিক সাহিত্য সেমিনারে, আবার কখনো রাজকীয় অতিথি হিসেবে পাক-ভারত ও আরব বিশ্বের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই ভ্রমণের বিরল সম্মান পেয়েছেন তিনি।
উপসংহার
যে স্বপ্ন নিয়ে ‘জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া’ যাত্রা শুরু করেছিল, তার সফল বাস্তবায়ন লক্ষ করছে দেশ ও জাতি। ‘জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া’ আজ দেশের গর্ব। দেশের ইসলামি শিক্ষা প্রচার-প্রসারের অগ্রদূত।
লেখক : শিক্ষক, জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া, চট্টগ্রাম