হোম > শিক্ষা > প্রাথমিক

ভেরিফিকেশনে প্রার্থীরা বাদ পড়ায় ক্ষোভ, মন্ত্রণালয়ের নরম সুর

সরদার আনিছ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র পাননি প্রায় দেড় হাজার চাকরিপ্রত্যাশী। দীর্ঘ আট মাস অপেক্ষার পর বিপুলসংখ্যক প্রার্থী ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও ডিসি বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন নিয়োগবঞ্চিতরা। বাদ পড়ার কারণ প্রকাশ, পুনঃযাচাই ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ চেয়ে তারা এসব কর্মসূচি পালন করে। এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের উপস্থিতিতে গতকাল শনিবার সচিবালয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা থেকে নিয়োগপত্র বিষয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বঞ্চিতদের পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। গতকাল মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ থানার মেরিট তালিকায় প্রথম ও পুরো জেলায় ১১তম হওয়া তামান্না নিয়োগপত্র পাননি। পুলিশ ও এনএসআই ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন তিনি। তার দাবি, ‘পলিটিক্যাল ট্যাগ’ দিয়ে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যদিও তিনি বা তার পরিবার কখনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, তার একাডেমিক রেকর্ড ভালো—বৃন্দাবন সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ও সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে মাস্টার্সেও ফার্স্ট ক্লাস। তবু চূড়ান্ত নিয়োগপত্রে নাম না থাকায় তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রার্থী জাহিদ হাসানও চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর নিয়োগপত্র পাননি। উপজেলায় ৮৩ জনের মধ্যে তার মেধাক্রম ছিল ৫৪তম। জাহিদের দাবি, তার কোনো রাজনৈতিক পদ নেই এবং তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। কেন তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কারণও জানানো হয়নি।

ভোলায় ২৫৬ জন সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে ৮৪ জন নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন—এমন দাবি করে তারা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। সুনামগঞ্জেও ৬৩৫ জন সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে ১২০ জন নিয়োগপত্র পাননি বলে দাবি করা হয়েছে। বাদ পড়া প্রার্থীদের কেউ কেউ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

‘চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক-২০২৫’ প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে গত শুক্রবার পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে—বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষভাবে পুনঃযাচাই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা, ভুল-ত্রুটি সংশোধন এবং ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে কতজন ও কী কারণে বাদ পড়েছেন, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় আরেক বিবৃতিতে আন্দোলনরত প্রার্থীদের একটি প্ল্যাটফর্ম দাবি করেছে, নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীর সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি। তবে ঠিক কতজন বাদ পড়েছেন তা সরকারিভাবে এখনো জানানো হয়নি।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া

এদিকে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এ ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল শনিবার বিকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

পোস্টে তিনি লেখেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ভুল রাজনীতির খেলা থেকে সরে আসুন। মেধাকে সম্মান দিন। সরকারি চাকরিতে প্রবেশ রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয় নয়। একজন নাগরিক হিসেবে চাকরিপ্রার্থীর মেধা ও যোগ্যতাই হওয়া উচিত একমাত্র বিবেচ্য বিষয়।

তিনি বলেন, ভেরিফিকেশনের নামে ফ্যাসিবাদী আমলের এই অপকর্ম পরিত্যাগ করুন। ফ্যাসিবাদ আমলের অনুরূপ যেকোনো কূটতৎপরতা জনগণ সহ্য করবে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এসবের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।

জামায়াত আমির বলেন, মেধাবী যুবসমাজসহ তরুণদের নিজেদের অধিকার আদায়ে আবারও সোচ্চার হতে হবে। ছাড় দিলে বাংলাদেশ মেধাহীন ফ্যাসিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।

এছাড়া সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনের নামে অন্তত ১,০০০ তরুণ নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি ভেরিফিকেশনের মানদণ্ড ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র না পাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বাদ পড়া প্রার্থীদের তালিকা ও কারণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগে বৈষম্যের অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবির ভেরিফিকেশনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, বাদ পড়া প্রার্থীদের কারণ জানানো এবং আপিলের সুযোগের দাবি জানিয়েছে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা মানববন্ধন করে সরকারকে এ ঘটনার ‘লাল কার্ড’ দেখায়। এছাড়া গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় ছাত্রশক্তি বিক্ষোভ থেকে সরকারের বিরুদ্ধে নিয়োগ কেলেঙ্কারির অভিযোগ তোলেন।

এর আগে গত বুধবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র ও পদায়ন আদেশ জারির প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো নির্বাচিত প্রার্থীর নিয়োগপত্র জারি করা না হলে কারণ উল্লেখ করে তালিকা ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠাতে হবে। বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জাতীয়তা, স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততা, ডোপ টেস্ট এবং ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাইয়ের পর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন বা এনএসআই প্রতিবেদনে বিরূপ মন্তব্য থাকলে নিয়োগ আদেশ জারি না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রার্থীদের প্রকৃত সংখ্যা কত, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের বিরূপ তথ্য পাওয়া গেছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তি কী। মন্ত্রণালয়ের পুনঃপরীক্ষা ও পর্যায়ক্রমে নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাস বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের পরবর্তী পদক্ষেপ।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় তার ফোন নম্বরে যোগাযোগ চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। গতকাল বিকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জেসমিন নাহারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সরাসরি তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।

পরে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার আসিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ এর নিয়োগ বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে শিক্ষা এবং প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রী এহছানুল হক মিলন উপস্থিত ছিলেন ।

এতে বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া ১ অক্টোবরের মধ্যে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেউ নিয়োগপত্র না পেলে তা পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন কিংবা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।

এ সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মিজ জেসমিন নাহার, অতিরিক্ত সচিব মনোয়ারা ইশরাত, অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌস-সহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গতকাল শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানান, যারা নিয়োগপত্র পাননি, ১ অক্টোবরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তাদের নিয়োগপত্র পাঠানো হবে।

প্রসঙ্গত, সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়েছিল গত ৮ ফেব্রুয়ারি। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত করা হয়। এর আগে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন।

প্রাথমিক শিক্ষকের নিয়োগপত্র নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে: গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে: ববি হাজ্জাজ

জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, শিক্ষার্থীদের জন্য ৬ নির্দেশনা

বাঁশখালীতে বন্যার্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ

শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বোর্ডগুলো

পরীক্ষা নয়, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি লটারিতে

প্রাথমিক শিক্ষক বদলি নিয়ে জরুরি নির্দেশনা

সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে স্কুল মিল

প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কর্মসূচি প্রত্যাহার

নীলক্ষেত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি সাংবাদিক মোতাহার