হোম > শিক্ষা > প্রাথমিক

শিক্ষক সংকটে স্থবির প্রাথমিকের লেখাপড়া

সরদার আনিছ

নানা জটিলতায় আটকে আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৭৮ হাজারেরও বেশি শূন্য ও সৃষ্ট পদে শিক্ষক নিয়োগ । নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, আদালতে মামলা, প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ পরীক্ষায় বিলম্ব এবং পদোন্নতিতে ধীরগতির কারণে শিক্ষক স্বল্পতা তীব্র আকার ধারণ করেছে।

দেশের ৬৫ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক এবং সৃষ্ট নতুন পদ মিলে ৭৮ হাজারেরও বেশি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের এ সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে। বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।

এদিকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ফলাফল চূড়ান্ত হওয়ার পরও গত আড়াই মাস ধরে আটকে আছে সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষকের নিয়োগ প্রক্রিয়া। দুদিনের লাগাতার আন্দোলনের পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের আশ্বাসে গত সোমবার সন্ধ্যায় কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন চাকরিপ্রার্থীরা, এরপরও কাটেনি অনিশ্চয়তা ।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রাথমিকের শিক্ষক সংকট নিরসনে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ সত্ত্বেও তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। সরকারের একেবারে শেষ সময়ে ১৪ হাজার ৩৮৪ শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিলেও তা সম্পন্ন করে যেতে পারেনি । এতে দেশে শিক্ষার ভিত্তি বলে বিবেচিত প্রাথমিকে শিক্ষকের সংকট বেড়েই চলেছে।

বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ও মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬৫ হাজার ৪৫৭টি বিদ্যালয়ে অনুমোদিত মোট চার লাখ ২২ হাজারের বেশি পদের বিপরীতে ৩৪ হাজার ১৫৯টি প্রধান শিক্ষকের পদই এখন শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৫ জনকে।

একইভাবে সহকারী শিক্ষক পদ রয়েছে তিন লাখ ৫৫ হাজার ৬৫৩টি, যার মধ্যে শূন্য ২৪ হাজার ৫৩৬টি। এছাড়াও ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক এবং পাঁচ হাজারের বেশি চারুকলার শিক্ষকসহ ২০ হাজারেরও বেশি সৃষ্ট পদ রয়েছে।

বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা মানে কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম ও তদারকিতে ঘাটতি থেকে যাওয়া। এ শূন্য পদের বিপরীতে পিএসসির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগের জন্য মাত্র এক হাজার ১২২টি পদের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে আবেদন করেছেন প্রায় সাত লাখ চাকরিপ্রার্থী। অর্থাৎ প্রতিটি পদের জন্য লড়বেন গড়ে ৬২৪ জন। গত বছরের অক্টোবর মাসে এ আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হলেও এখনো পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত হয়নি।

পিএসসি বলছে, এ বিশাল আবেদনকারীর পরীক্ষা আয়োজন করা একটি বড় কারিগরি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরাসরি নিয়োগের এ এক হাজার ১২২টি পদ পূরণ হলেও মূল সমস্যার সমাধান হবে না; যদি না পদোন্নতির ৮০ শতাংশ কোটা সচল হয়।

এদিকে গত বছর জারি করা নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেতে হলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে অন্তত ১২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে মৌলিক প্রশিক্ষণ ও চাকরি স্থায়ীকরণ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সারা দেশে এমন কয়েক হাজার সহকারী শিক্ষক রয়েছেন, যাদের এ অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা আছে, কিন্তু আদালতের একটি মামলার স্থগিতাদেশের কারণে মন্ত্রণালয় তাদের পদোন্নতি দিতে পারছে না।

বর্তমানে অনেক বিদ্যালয়ে সিনিয়র সহকারী শিক্ষকরা ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। এতে যেমন তাদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ছে, তেমনি স্থায়ী পদ না হওয়ায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এছাড়াও বিপুলসংখ্যক সহকারী শিক্ষক না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে দ্রুত এ জট খোলা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জ সদরের সরকারি আদর্শ শিশু বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন শাহীন বলেন, অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায়, যাদের ইনচার্জ দেওয়া হয়েছে, সহকারী শিক্ষকরা তাদের নির্দেশনা ঠিকমতো মানছেন না। এছাড়া সহকারী শিক্ষকদের পদ শূন্য থাকায় সার্বিকভাবে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদের মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করার বিধান রয়েছে। গত বছর এ বিধিমালা চূড়ান্ত করা হলেও সিংহভাগ পদোন্নতিযোগ্য পদের জট খুলছে না একটি মামলার কারণে। এ কারণে যোগ্যতাসম্পন্ন হাজার হাজার সহকারী শিক্ষক পদোন্নতির সব শর্ত পূরণ করেও দায়িত্ব পাচ্ছেন না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকে শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার বিদ্যালয়গুলোতে আরো প্রায় ২০ হাজার নতুন পদ সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৫৭২টি সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ এরই মধ্যে অনুমোদন দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, যা সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হতে পারে।

এছাড়া ধর্মীয় শিক্ষকের জন্য ৯ হাজার ১৬৬ পদ এবং চারুকলার শিক্ষকের জন্য পাঁচ হাজারের বেশি পদ সৃষ্টির কাজ শুরু হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান শিক্ষক সংকট নিরসনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন বলেছেন, খুব দ্রুতই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ৩২ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষক পদের মামলার জটিলতা নিরসনে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানে প্রধান শিক্ষক পদের একটি বড় অংশ খালি রয়েছে। মূলত মামলার কারণে পদোন্নতি প্রক্রিয়াটি কিছুটা থমকে আছে। খুব দ্রুতই এর নিষ্পত্তি হবে। এ সংকট সমাধানে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রাথমিকের ১৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ স্থগিত রাখতে আইনি নোটিশ

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রথম নারী ডিজি

কোচিং-নোট গাইড বন্ধ করে দেওয়া হবে: ববি হাজ্জাজ

সরকারি প্রাথমিকে ভর্তিতে স্বাস্থ্য তথ্য বাধ্যতামূলক করে নির্দেশনা জারি

প্রাথমিকে সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষকের যোগদানে অনিশ্চয়তা

আগামী বছর থেকে নির্ধারিত সময়েই হবে বৃত্তি পরীক্ষা

সারা দেশে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শুরু

সারা দেশে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শুরু আজ

প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য অধিদপ্তরের জরুরি নির্দেশনা