অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজারে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে। দেশটির অধিকাংশ শহর ও উপশহরে বাড়ির দাম কমছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে জাতীয়ভাবে বাড়ির দাম সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকেরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ির দাম এখন পর্যন্ত ৩ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। শুধু আগস্ট মাসেই দেশজুড়ে বাড়ির দাম কমেছে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। রাজধানী শহরগুলোর ৯৩ শতাংশ উপশহরেই এখন বাড়ির দাম কমতির দিকে।
সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে সিডনি। আগস্টে শহরটির বাড়ির দাম কমেছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং তিন মাসে কমেছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। বছরের শুরু থেকে সিডনিতে বাড়ির দাম কমেছে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। মেলবোর্নেও পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যাংক কমনওয়েলথ ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, মার্চের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে দেশটির আবাসন মূল্য প্রায় ৯ শতাংশ কমতে পারে। আগামী বছরের এপ্রিল নাগাদ বাজারে সর্বনিম্ন অবস্থান তৈরি হতে পারে। সিডনিতে প্রায় ১৩ শতাংশ এবং মেলবোর্নে ১২ শতাংশ পর্যন্ত দরপতনের আশঙ্কা করছে ব্যাংকটি।
অন্যদিকে এএমপি প্রায় ১০ শতাংশ জাতীয় দরপতনের পূর্বাভাস দিয়েছে। স্বাধীন আবাসন অর্থনীতিবিদ ক্যামেরন কুশারও মনে করছেন, এবারের পতন ৮ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে হতে পারে। তার মতে, এটি গত প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বড় আবাসন বাজারের মন্দায় পরিণত হতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাড়ির দাম কমার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে সুদের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের জন্য কর সুবিধায় পরিবর্তন, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া। এর পাশাপাশি বাজার নিয়ে ক্রেতাদের আস্থাও কমেছে। ফলে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা এখন বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন।
তবে পুরো অস্ট্রেলিয়ায় পরিস্থিতি একই নয়। সিডনি ও মেলবোর্নে আবাসন বাজার দুর্বল হলেও কিছু আঞ্চলিক এলাকা ও তুলনামূলক কম দামের বাজারে এখনো চাহিদা রয়েছে। বেশি দামের বাড়ির বদলে ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অ্যাপার্টমেন্ট, টাউনহাউস এবং তুলনামূলক কম দামের সম্পত্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
পার্থও এখন পর্যন্ত অন্য বড় শহরগুলোর তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে সেখানেও বাজারের গতি কমতে শুরু করেছে। গত এক বছরে বাড়ির তালিকা বেড়েছে এবং আগের তুলনায় বেশি সংখ্যক বাড়ি নির্ধারিত দামের নিচে বিক্রি হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের শক্তিশালী বাজারটিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে।
ব্রিসবেনেও বাড়ির মূল্য এখনো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকলেও নিলামে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমেছে। অন্যদিকে আঞ্চলিক কুইন্সল্যান্ডের কিছু এলাকায় তুলনামূলক কম দামের কারণে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে। ভিক্টোরিয়ার বেনডিগো, ব্যালারাট ও শেপারটনের মতো আঞ্চলিক শহরেও তুলনামূলক ভালো ভাড়ার আয় পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজার এখন আর আগের মতো ‘যে কোনো সম্পত্তি কিনলেই লাভ’—এমন অবস্থায় নেই। বিনিয়োগকারীরা এখন বাড়ির দাম ভবিষ্যতে কত বাড়বে, তার চেয়ে ভাড়া থেকে কত আয় হবে, সম্পত্তির দাম কতটা নাগালের মধ্যে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো কেমন—এসব বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছর এরই মধ্যে তিন দফা সুদের হার বাড়ানো হয়েছে এবং ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদদের অনেকে আরও এক দফা বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন। সুদের হার বাড়লে গৃহঋণের কিস্তি আরও বাড়বে, যা আবাসন বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে বাজারে পতন হলেও এটিকে এখনই আবাসন বাজারের ধস হিসেবে দেখছেন না অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, অঞ্চলভেদে বাজারের চিত্র ভিন্ন এবং কোথাও কোথাও কম দামের সম্পত্তির চাহিদা এখনো রয়েছে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজারে সামগ্রিক পতনের পাশাপাশি একই সময়ে কিছু এলাকায় সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
দেশটির রাজধানী শহরগুলোর প্রায় ৯৩ শতাংশ আবাসিক সম্পত্তির মূল্য কমেছে। শীতকালজুড়ে গড় বাড়ির মূল্য থেকে প্রায় ৪০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার হারিয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, ঋণের প্রাপ্যতা এবং ক্রেতাদের আস্থার ওপর নির্ভর করবে আবাসন বাজারের পতন কতটা গভীর হবে।
সূত্র: এসবিএস অস্ট্রেলিয়া ও এসবিএস নিউজ