ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে নিজের অবস্থান আরো স্পষ্ট করেছেন মার্কিন র্যাপার ম্যাকলেমোর। এড শিরানের ‘লুপ’ ট্যুর থেকে পাওয়া তার পুরো ১০ লাখ ডলার ছয়টি সংস্থার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক ও গিলেট স্টেডিয়ামের মালিক রবার্ট ক্রাফটকে তার অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ম্যাকলেমোর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ বার্তায় ম্যাকলেমোর বলেন, ‘ফিলিস্তিনিরা দশকের পর দশক মৌলিক অধিকার ছাড়া বেঁচে আছে; মুক্তির জন্য তাদের আর একটি দিনও অপেক্ষা করা উচিত নয়। আমার মনোযোগ এখানেই থাকবে। আমি ফিলিস্তিনিদের পাশে এবং তাদের মুক্তির লড়াইয়ের সঙ্গে থাকব।’ তিনি আরো বলেন, আলোচনাকে আবার সেই ফিলিস্তিনিদের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন, যারা এখনো প্রাণ হারাচ্ছে, সামরিক দখলদারত্বের মধ্যে বসবাস করছে এবং নিজেদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ম্যাকলেমোর তার বার্তায় বলেন, এড শিরানের ‘লুপ’ ট্যুর থেকে পাওয়া তার পুরো ১০ লাখ ডলারের নিট আয় ফিলিস্তিনিদের সরাসরি সহায়তা করা ছয়টি সংস্থায় দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি রবার্ট ক্রাফটকে এই অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, মতপার্থক্য থাকলেও অন্তত একটি বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব—ফিলিস্তিনি মানুষের জীবন রক্ষার মূল্য অন্য যেকোনো মানুষের জীবনের চেয়ে কম নয়।
ম্যাকলেমোরের এই ঘোষণা এসেছে এড শিরানের ট্যুর থেকে তাকে বাদ দেওয়ার বিতর্কের মধ্যে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ৪ সেপ্টেম্বরের পরিবেশনায় তিনি ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগানের প্রতি সমর্থন জানান এবং গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের মানুষের কথা ভুলে না যাওয়ার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যের পর ইসরাইল-সমর্থক সংগঠন ইসরাইলি-আমেরিকান কাউন্সিল তাঁকে ট্যুর থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে একটি পিটিশন করে।
পরদিন মঞ্চে আবারও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন ম্যাকলেমোর। ইহুদি দর্শকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইসরাইলের সমালোচনা বা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে নয়; তার বার্তা শান্তি, ভালোবাসা এবং সব মানুষের মর্যাদা, সম্মান ও সমতার পক্ষে।
এরপর এড শিরানের উত্তর আমেরিকা সফরের পরবর্তী অংশ থেকে ম্যাকলেমোরকে বাদ দেওয়া হয়। শিরান নিজে এক বিবৃতিতে বলেন, সিদ্ধান্তটি তিনি এককভাবে নেননি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রবার্ট ক্রাফটসহ কয়েকজন স্টেডিয়াম মালিক জানিয়ে দিয়েছিলেন, ম্যাকলেমোর ওপেনিং অ্যাক্ট হিসেবে থাকলে তাদের স্টেডিয়ামে ট্যুর আয়োজন করা সম্ভব হবে না। শেষ পর্যন্ত আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্তে ম্যাকলেমোরকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বিতর্কটি আরো বিস্তৃত হয় যখন ট্যুরের বাকি চার ওপেনিং অ্যাক্ট—ফিনিয়াস, অ্যারন রো, বেওগা ও লুকাস গ্রাহাম—ম্যাকলেমোরের প্রতি সংহতি জানিয়ে ট্যুর থেকে সরে দাঁড়ান।
রবার্ট ক্রাফট অবশ্য ম্যাকলেমোরের আহ্বানে সরাসরি ১০ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দেননি। এড শিরান ক্রাফটকে ফোন করে মানবিক সংকট মোকাবিলায় ২০ লাখ ডলার দেওয়ার অনুরোধ করেন। এর পর ক্রাফট জানান, তিনি ও শিরান মিলে ২০ লাখ ডলার ‘এ অঞ্চলে’ মানবিক সহায়তার জন্য দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তবে কোন সংস্থা বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে তখন নির্দিষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি।
ম্যাকলেমোর তার বার্তায় ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় কাজ করা অভিভাবক, চিকিৎসক, প্যারামেডিক, সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মীদের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব মানুষের ঝুঁকি তার নিজের ঝুঁকির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। একই সঙ্গে তিনি সমর্থকদের আহ্বান জানান, সংবাদচক্র একসময় অন্যদিকে চলে গেলেও যেন ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা ভুলে না যান।
এ ঘটনায় সাবেক এনএফএল কোয়ার্টারব্যাক কলিন ক্যাপারনিকও ম্যাকলেমোরের পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এনএফএল স্টেডিয়ামের মালিকেরা ম্যাকলেমোরকে তার রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে একসঙ্গে চাপ প্রয়োগ করে সরিয়ে দিয়েছেন। এটি ক্যাপারনিকের নিজের প্রতিবাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। তবে এটি ক্যাপারনিকের অভিযোগ; গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এ অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
অন্যদিকে ক্রাফট ম্যাকলেমোরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অতীতে ‘ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য ও চিত্রকল্প’-এর অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। এই অভিযোগটি ক্রাফটের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখযোগ্য; ম্যাকলেমোর অতীতে এ ধরনের বিতর্কের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন এবং সাম্প্রতিক বক্তব্যে তার অবস্থানকে শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও সমতার পক্ষে বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
ফলে ঘটনাটি এখন শুধু একজন শিল্পীর ট্যুর থেকে বাদ পড়ার ঘটনা নয়; এটি শিল্পীর রাজনৈতিক ও মানবিক বক্তব্য, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক জনপরিসরের বিতর্কেরও অংশ হয়ে উঠেছে। ম্যাকলেমোর অবশ্য তার বক্তব্য ও আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়ে স্পষ্ট করেছেন, ট্যুরে তার ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণের প্রশ্নের চেয়েও তার কাছে ফিলিস্তিনিদের মানবিক দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।