হোম > সাহিত্য সাময়িকী > মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস

সুলতানা শাজারাতুদ দুর

দাসী থেকে রানি

ইলিয়াস মশহুদ

ইতিহাসের পাতায় কিছু মানুষ থাকেন, যাদের অবদান যুগান্তকারী হলেও তাদের নাম আলোচনায় আসে না ততটা। ক্রুসেডযুদ্ধের নায়ক সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি, বাইবার্স, নুরুদ্দিন জেনগি, রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট, বোহেমন্ড, লুই নবম প্রমুখের নাম ঘুরেফিরে বারবার উচ্চারিত হলেও একই সময়ের তুমুল আলোচিত, মেধাবী ও কুশলী নারী সুলতানা শাজারাতুদ দুরকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।

শাজারাতুদ দুর ছিলেন তেরো শতকের এক দাসী, যিনি ইতিহাসকে প্রভাবিত করে মিসরের রাজনৈতিক চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন। তবে তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে সামান্য মতভেদ আছে—কেউ বলেন তিনি খাওয়ারিজম অঞ্চলের, কেউ আর্মেনীয়, আবার কেউ বলেছেন তুর্কি বংশোদ্ভূত। তবে সব বর্ণনাতেই একটি বিষয় নিশ্চিত, তিনি একটা সময় দাসী ছিলেন। শাজারাতুদ দুরকে কিনেছিলেন সুলতান সালেহ আইয়ুব, তিনি তখনো মিসরের শাসক হননি। পরে সালেহ তাকে মুক্ত করে বিয়ে করেন।

মিসরে তাকে নিয়ে লোককাহিনিও আছে। বলা হয়, তিনি ‘আলমুকতাদির’ নামে এক খলিফার মেয়ে ছিলেন। তার পিতা তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং মুক্তার তৈরি পোশাক পরাতেন। সেখান থেকেই তার নাম হয় ‘শাজারাতুদ দুর’ বা ‘মুক্তার বৃক্ষ’।

শাজারাতুদ দুর ছিলেন অনন্য সুন্দরী, তুষারসদৃশ ফর্সা গায়ের রঙ, ঘন কালো চুল এবং সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী। গাম্ভীর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন এবং যুক্তিপূর্ণ ও সাবলীল বাকশক্তির কারণে জ্ঞানীদের মাঝেও তার কথা প্রাধান্য পেত।

তার জীবন ছিল অসাধারণ বিচক্ষণতা, সাহস ও দৃঢ়তার প্রতীক। আধুনিক ইতিহাসবিদদের দ্বারা উপেক্ষিত হলেও ক্রুসেডযুদ্ধের পটভূমিতে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১২৩৯ খ্রিষ্টাব্দে শাজারাতুদ দুর প্রথমবার ইতিহাসের আলোয় আসেন। ১২৪০ সালে সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুব তাকে নিজের হারেমে অন্তর্ভুক্ত করলে ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায়। কেরাক দুর্গে বন্দিত্বের দিনগুলোয় তিনি স্বামীর পাশে ছিলেন; সেখানেই জন্ম হয় তাদের একমাত্র পুত্রসন্তান খলিলের। এখান থেকেই তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে।

১২৪৯ সালে ক্রুসেডারদের নেতৃত্বে লুই নবম যখন দিমইয়াত দখল করে মানসুরার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুব মারা যান। পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। এমন সংকটময় মুহূর্তে সুলতানের মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা মানে সেনাদের মনোবল ভেঙে পড়া, রাষ্ট্র ভেঙে পড়া, শত্রুপক্ষের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। তবে এই কঠিন মুহূর্তেও শাজারাতুদ দুর ছিলেন পাহাড়সম স্থির। তিনি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে দীর্ঘ তিন মাস স্বামীর মৃত্যুসংবাদ গোপন রাখেন।

এ সময় তিনি আমির ফখরুদ্দিন ইবনে শায়খুশ শুয়ুখকে ডেকে গোপনীয়তা বজায় রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বলেন। প্রয়াত সুলতানের লাশ গোপনে কায়রোর কবরস্থানে দাফন করা হয়। ফখরুদ্দিনের মাধ্যমে তিনি সুলতানের তাবুতে চিকিৎসকদের নিয়মিত যাতায়াত দেখিয়ে এবং আবেদন-নিবেদন গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত দিতেন, যা দেখে মনে হতো সুলতানই নির্দেশ দিচ্ছেন।

একপর্যায়ে সংবাদটি আর গোপন থাকেনি; এ-কান ও-কান হয়ে ফাঁস হয়ে যায়। সুলতানের মৃত্যুর সংবাদ জানামাত্রই লুই নবম কায়রো অভিমুখে এগিয়ে আসেন। তবে শাজারাতুদ দুরও বসে থাকেননি। তিনি সুলতানের পুত্র ও উত্তরাধিকারী তুরান শাহকে দ্রুত ডেকে পাঠান। তার না পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সেনাবাহিনীকে নিজের মেধা ও বুদ্ধিতে আগলে রাখেন। তার এমন কৌশলের কারণেই মানসুরার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অক্ষত থাকে; বরং মুসলিম বাহিনী ক্রমান্বয়ে আক্রমণে ফিরে যায়।

১২৫০ সালে তুরান শাহ মিসরে এসে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে এবং শাজারাতুদ দুরের পরিকল্পনায় ক্রুসেডাররা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। রাজা লুই নবম বন্দি হন। দিমইয়াত পুনরুদ্ধার হয়, বিশাল পরিমাণ মুক্তিপণ রাষ্ট্রভাণ্ডারে জমা পড়ে। এই বিজয়ের নেপথ্যনায়িকা নিঃসন্দেহে শাজারাতুদ দুর।

মানসুরার বিজয়ের পর তুরান শাহ নিহত হন। সাম্রাজ্যের এই সংকটকাল শাজারাতুদ দুর শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে এ সময় ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। মামলুকরা বুঝতে পারে—যে নারী সংকটকালে দেশকে রক্ষা করলেন, সেনাদের ঐক্য ধরে রাখলেন, পরিকল্পনায় যুদ্ধে জয় এনে দিলেন; দেশ পরিচালনায় তার চেয়ে যোগ্য আর কে হতে পারে? অতএব, ১২৫০ সালে তাকে মিসরের ‘সুলতানা’ ঘোষণা করা হয়।

তবে সিরিয়ার আমিররা তীব্র বিরোধিতা করেন। কিন্তু মামলুকরা সেসব বিরোধিতা উপেক্ষা করে শাজারাতুদ দুরকে ‘সম্রাজ্ঞী’ হিসেবে অভিষিক্ত করে। তাকে ‘উম্মে খলিল’ উপাধি দেওয়া হয়। প্রথম নারী শাসক হিসেবে তার নামে মুদ্রা চালু করা হয় এবং জুমার খুতবায় আব্বাসি খলিফার পর তার জন্য দোয়া করা হতো। এভাবে তিনি হয়ে ওঠেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নারী, যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেন।

ক্ষমতায় বসেই তিনি লুই নবমের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে দিমইয়াত নগরী পুনরুদ্ধার করেন এবং লুইয়ের মুক্তিপণ হিসেবে ১০ লাখ বাইজান্টাইন মুদ্রা লাভ করেন। এর ফলে সমগ্র মিসর ক্রুসেডারদের দখলমুক্ত হয়।

তবে শাসক হিসেবে শাজারাতুদ দুরের শাসনকাল মসৃণ ছিল না। তাকে নানা চাপ মোকাবিলা করতে হয়। ফলে অল্প সময় পরেই তাকে ‘সম্রাজ্ঞী’র পদ থেকে অব্যাহতি নিতে হয়। কেননা, সে সময় মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে কোনো নারী শাসক পদে বসা ছিল অভূতপূর্ব।

বাগদাদের আব্বাসি খলিফা এবং প্রধান বিচারপতি সুলতানুল উলামা ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম তার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেন। তাতে বলা হয়, শরিয়া অনুযায়ী কোনো নারীর শাসনভার গ্রহণের অধিকার নেই। এরপর আব্বাসি খলিফা মামলুকদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলেন, ‘যদি তোমাদের মধ্যে পুরুষশূন্যতা সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের জানাতে পারো; আমরা তোমাদের জন্য উপযুক্ত কোনো পুরুষ পাঠিয়ে দেব।’

জনগণের বিক্ষোভ ও আলেমদের নিন্দা ক্রমেই বাড়তে থাকে। এদিকে শাজারাতুদ দুর পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। তিনি মামলুক সেনাপতি ইজ্জুদ্দিন আইবেককে বিয়ে করে তার হাতে শাসনভার তুলে দেন।

ইতিহাস সাক্ষী, আইবেক যদিও সুলতান হয়েছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা না থাকায় আড়ালে থেকে প্রকৃত কলকাঠি নাড়তেন শাজারাতুদ দুরই। এভাবে প্রায় সাত বছর তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখেন।

ইজ্জুদ্দিন আইবেকের শাসনামল ছিল নানা সংঘাতপূর্ণ ও জটিলতাময়। তার রাজত্বকাল ছিল আইয়ুবিদের ধমকি, ক্রুসেডারদের হুমকি, খাওয়ারিজমদের অপতৎপরতা এবং সহকর্মী মামলুকদের অসহযোগিতায় ভরা।

আইয়ুবি ও মামলুকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসনে আব্বাসি খলিফা আল মুস্তানসির বিল্লাহ মধ্যস্থতা করে একটি শান্তিচুক্তি স্থাপন করেন। চুক্তিতে জর্দান নদী পর্যন্ত মিসর মামলুক সুলতান আইবেকের এবং বাকি বিলাদুশ শাম আইয়ুবিদের অধীনে থাকবে বলে স্থির হয়। এই চুক্তি লুই নবম ও ক্রুসেডারদের দুর্বল করে দেয়। এদিকে মামলুক কমান্ডার ফারিসুদ্দিন আকতাইয়ের জুলুম-নির্যাতন চরম রূপ নিলে শাজারাতুদ দুরের পরামর্শে আইবেক তাকে হত্যা করেন।

আইবেক ও শাজারাতুদ দুরের দাম্পত্য জীবনের প্রথম সাত বছর সুখ-স্বচ্ছন্দে কাটলেও একপর্যায়ে ক্ষমতার মোহে আইবেকের মানসিকতাও পরিবর্তিত হয়। আইবেক যখন মসুলের শক্তিশালী শাসক বদরুদ্দিন লুলু আতাবেকির কন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন (১২৫৬ খ্রি.), তখন শাজারাতুদ দুর নিজেকে অপমানিত বোধ করেন। আহত নারী শাজারাতুদ দুর প্রতিশোধ নিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। পরিকল্পনা করে তিনি স্বামীকে সাক্ষাতের আহ্বান জানান। ১২৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ এপ্রিল রাতে আইবেক গোসলখানায় প্রবেশ করলে শাজারাতুদ দুরের নির্দেশে তার বিশেষ সেবিকারা কাঠের খড়ম দিয়ে পিটিয়ে তাকে হত্যা করে।

সুলতানের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মামলুক আমির এবং জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। মামলুকরা শাজারাতুদ দুরকে বন্দি করে এবং প্রয়াত সুলতানের ১৫ বছর বয়সি পুত্র নুরুদ্দিন আলিকে সুলতান হিসেবে ঘোষণা করে। নুরুদ্দিন আলির মা, যিনি আইবেকের প্রথম স্ত্রী ছিলেন এবং সাত বছর ধরে উপেক্ষিত ছিলেন, তিনি প্রতিশোধ নিতে শাজারাতুদ দুরকেও সেবিকাদের দিয়ে স্বামীর পরিণতি বরণ করান। এরপর তার লাশ কেল্লার প্রাচীর থেকে খাদে ফেলে দেওয়া হয়।

কয়েক দিন পর শাজারাতুদ দুরের লাশ উদ্ধার করে তার নিজের বানানো কবরস্থানে দাফন করা হয়। নতুন সুলতান নুরুদ্দিন আলির মা প্রতিশোধ-আনন্দে মিষ্টিও বিতরণ করেছিলেন বলে জানা যায়।

ইতিহাসবিদরা শাজারাতুদ দুরের ভূমিকাকে নিয়ে মতানৈক্য করেছেন। তার সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সফল শাসনকাল মামলুকদের কাছে তার সামরিক ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার স্বীকৃতি ছিল। তিনি ছিলেন প্রয়াত আইয়ুবি সুলতানের স্ত্রী এবং তার পুত্রের মা। মামলুকরা আব্বাসি খলিফার হুমকির মুখে তাকে সরিয়ে আইবেককে সুলতান বানালেও শাজারাতুদ দুরকে আইয়ুবি রাজপরিবারের প্রতীক হিসেবে আইবেকের পাশে রেখে নিজেদের আইনসম্মত অবস্থান বজায় রাখতে চেয়েছিল। মহান এই নারীর শেষটা করুণ হলেও তার নাম ইতিহাসের পাতায় চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে।

নারী মশা মারতে ৩ কোটি ২০ লাখ পুরুষ মশা ছাড়তে চায় গুগল

যে কারণে মানুষ মৃত্যুর পরও স্মরণীয় হয়ে থাকতে চায়

এক টিকাতেই মিলবে ক্যানসার থেকে মুক্তি

মাখন-ঘি নাকি অলিভ অয়েল-সূর্যমুখী তেল—কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর

ভুল থেকে যেভাবে হয়েছিল ম্যাচ বা আধুনিক দেশলাইয়ের আবিষ্কার

এআই যুগে বদলে যাচ্ছে অনলাইন কাজের জগৎ

স্ট্রেসে বাড়তে পারে ব্রণ, একজিমা ও সোরিয়াসিস

সবখানে ঈদ, এখানে শুধু অপেক্ষা

ট্রায়াল রুম-হোটেলে গোপন ক্যামেরা থাকলে জানাবে ৩ অ্যাপ

আদ-দ্বীন হাসপাতালের সেই ওয়ার্ড সিলগালার ঘোষণা