হঠাৎ বসার ঘরের মেঝে দিয়ে একটি মাকড়সা দৌড়ে গেল। এমন দৃশ্য দেখে আপনার কেমন লাগবে? ভয় পেয়ে দূরে সরে যাবেন, নাকি মাকড়সাটিকে সরিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক কাজে ফিরবেন?
মাকড়সা নিয়ে ভয় অনেকেরই আছে। অথচ বেশির ভাগ মাকড়সা বিষধর হলেও এদের খুব সামান্য একটি অংশই মানুষের জন্য বিপজ্জনক।
যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে মাকড়সার কামড়ে ১০ জনেরও কম মানুষের মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হয়। তবে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন।
তারপরও অনেক মানুষ মাকড়সা কিংবা সাপের প্রতি তীব্র ভয় অনুভব করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাকড়সা দেখার কথা মনে হলেই অস্বস্তি তৈরি হয়। এমনকি মাকড়সার জালের কথাও কারো কারো মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
তবে সব ভয়কে ফোবিয়া বলা যায় না। ভয় যখন অস্বাভাবিক মাত্রায় তীব্র হয়ে ওঠে এবং দৈনন্দিন জীবনে বাধা তৈরি করে, তখন সেটি ফোবিয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রশ্ন হলো, সাপ ও মাকড়সার মতো প্রাণীর প্রতি এমন ভয় এত সাধারণ কেন? মানুষ কি এ ধরনের ভয় নিয়েই জন্মায়, নাকি অভিজ্ঞতা থেকে তা তৈরি হয়?
ভয় আর ফোবিয়ার পার্থক্য
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অবস্থিত রাটগার্স ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ভ্যানেসা লোবুর মতে, ভয় মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুভূতি। কারণ, সম্ভাব্য বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ভয় মানুষকে সতর্ক করে।
তিনি বলেন, ভয় আমাদের সম্ভাব্য বিপজ্জনক বিষয় থেকে সুরক্ষা দেয়।
তবে ভয় যখন অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে এবং একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা তৈরি করে, তখন সেটিকে ফোবিয়া হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
হাঙ্গেরির ইউনিভার্সিটি অব পেচের ভিজ্যুয়াল কগনিশন অ্যান্ড ইমোশন ল্যাবের পরিচালক আন্দ্রাশ জিদো বলেন, ভয়কে একটি ধারাবাহিক বিষয় হিসেবে দেখা যায়। সাধারণ ভয় দিয়ে এর শুরু। কারণ, প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো কিছুকে ভয় পান।
তবে সেই ভয় যখন দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটি ফোবিয়া হতে পারে।
ভ্যানেসা লোবুর মতে, ফোবিয়া সাধারণত বাস্তব হুমকির তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের কথা বলা যায়। দেশটিতে থাকা অধিকাংশ সাপের প্রজাতি মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়। ফলে সাপের প্রতি চরম ভয় অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব হুমকির তুলনায় অযৌক্তিক হতে পারে। তখন সেটিকে ফোবিয়া হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
মানুষ কি ফোবিয়া নিয়েই জন্মায়?
মাকড়সা বা সাপের ভয় যতই সাধারণ হোক, অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন না যে মানুষ এসব ফোবিয়া নিয়ে জন্মায়।
ভ্যানেসা লোবুর মতে, খুব ছোট শিশুরা ভয় অনুভব করতে পারে না। কারণ, কোনো কিছুকে ভয় পাওয়ার আগে সেটিকে হুমকি হিসেবে বোঝার সক্ষমতা তৈরি হওয়া প্রয়োজন।
তার ভাষায়, ভয় পরে দেখা যায়। কারণ, ভয় পাওয়ার জন্য বুঝতে হয় কোনো কিছু হুমকিস্বরূপ। আর এ জন্য পৃথিবী সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান থাকা দরকার।
তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের মধ্যে সাপ ও মাকড়সার মতো কিছু প্রাণীর প্রতি সম্ভাব্য বিপদের সংকেত দ্রুত শনাক্ত করার প্রবণতা থাকতে পারে।
অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টেফানি হোলের একটি গবেষণায় শিশুদের সামনে ফুল ও মাছের ছবির পাশাপাশি সাপ ও মাকড়সার ছবি দেখানো হয়। এতে দেখা যায়, ফুল ও মাছের ছবির তুলনায় সাপ ও মাকড়সার ছবি দেখলে শিশুদের চোখের মণি বেশি প্রসারিত হয়।
চোখের মণি প্রসারিত হওয়া সম্ভাব্য বিপদ উপলব্ধির একটি ইঙ্গিত হতে পারে। এর সঙ্গে নরঅ্যাড্রেনার্জিক সিস্টেমের সক্রিয়তার সম্পর্ক রয়েছে। এটি শরীরের ‘লড়াই অথবা পালিয়ে যাওয়া’ প্রতিক্রিয়ার অংশ।
এই প্রতিক্রিয়ার সময় হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ ও শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়। শরীর তখন সম্ভাব্য বিপদের মুখোমুখি হওয়া অথবা সেখান থেকে পালানোর জন্য প্রস্তুত হয়।
স্টেফানি হোল মনে করেন না যে সাপ বা মাকড়সার ভয় পুরোপুরি জন্মগত। তবে পরিবেশের কিছু বিষয় মানুষ অন্য কিছুর তুলনায় দ্রুত শনাক্ত করতে পারে। এর পেছনে ওই প্রাণীগুলোর চলাচলের ধরনও ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, পৃথিবীর কিছু বিষয়কে ভয় করতে শেখার জন্য মানুষ যেন একধরনের প্রস্তুতি নিয়ে থাকে।
সাপ ও মাকড়সাই কেন?
ভ্যানেসা লোবুর মতে, সাপ ও মাকড়সাকে অন্য অনেক প্রাণীর তুলনায় ভয় পাওয়ার প্রবণতার একটি কারণ হলো এগুলো মানুষের কাছে ‘অদ্ভুত’ মনে হয়।
শিশুরা সাধারণত চার পা আছে এবং হেঁটে চলে—এমন প্রাণীর সঙ্গে বেশি পরিচিত হয়। সাপের ক্ষেত্রে তা নয়। মাকড়সার চলাফেরাও অন্য প্রাণীর তুলনায় অস্বাভাবিক।
এই অস্বাভাবিকতা মানুষের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নির্দিষ্ট কিছু প্রাণীকে ভয় করার এই প্রবণতার সঙ্গে বিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।
আন্দ্রাশ জিদোর মতে, প্রাচীন মানুষের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অনিশ্চিত। মানবজাতির বিকাশের কোনো এক পর্যায়ে যে ভয়গুলো ছিল, সেগুলো তখন যুক্তিসঙ্গত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক ভয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আর তেমন উপকারী বা যুক্তিসঙ্গত থাকেনি।
তবে শুধু এই বিবর্তনগত প্রবণতা কোনো ফোবিয়া তৈরি করে না। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্যানেসা লোবুর মতে, কোনো প্রাণী বা বস্তুর সঙ্গে সরাসরি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হলে সেটিকে ভয় পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বিশেষ করে আগে থেকেই যদি ওই বিষয়টির প্রতি ভয় পাওয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, তাহলে সেই ভয় আরও সহজে তৈরি হয়।
অন্য কাউকে ভয় পেতেও দেখেও একইভাবে শেখা যায়।
কেউ মাকড়সার কামড় খেয়ে চমকে গেলেন। তার মা-বাবাও যদি আতঙ্কিত হয়ে বলেন, ‘এটা খুব খারাপ’, তাহলে শিশুর মধ্যে প্রাণীটির প্রতি ভয় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আরো বেড়ে যেতে পারে।
এ কারণেই ফোবিয়া এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করেন স্টেফানি হোল।
সিনেমা-বইও কি ভয় বাড়ায়?
সাপ ও মাকড়সার প্রতি মানুষের ভয় তৈরিতে জনপ্রিয় সংস্কৃতিরও ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করেন ভ্যানেসা লোবু।
তিনি বলেন, সিনেমা ও বইয়ের দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। সেখানে সাপ বা মাকড়সাকে খুব কমই ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখানো হয়।
বরং ভয়ংকর প্রাণী হিসেবেই তাদের উপস্থাপন করা হয়। ফলে বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সিনেমা, বই ও অন্যান্য জনপ্রিয় সংস্কৃতিও মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রকৃতির প্রাণীকে ঘিরে তৈরি ফোবিয়াকে বায়োফোবিয়া বলা হয়। এসব ভয় তৈরির পেছনে মানুষের বসবাসের পরিবেশও ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্দ্রাশ জিদো এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। কোনো ব্যক্তি কতটা নগরায়িত পরিবেশে বসবাস করেন এবং তাঁর প্রাণীভীতির মধ্যে সম্পর্ক আছে কি না, তা তিনি পরীক্ষা করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো এলাকা যত বেশি নগরায়িত, বায়োফোবিয়া তত বেশি সাধারণ।
জিদোর মতে, যারা প্রকৃতির মধ্যে বেশি সময় কাটান এবং প্রকৃতির সঙ্গে যাদের সরাসরি অভিজ্ঞতা বেশি, তারা সাধারণত এমন প্রাণীকে তুলনামূলক কম ভয় পান, যেগুলোর মুখোমুখি তাদের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বর্তমানে বিশ্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ শহরাঞ্চলে বাস করেন। সেই বিবেচনায় প্রাণী-সম্পর্কিত ফোবিয়া এত সাধারণ হওয়া খুব একটা বিস্ময়কর নয়।
কীভাবে ভয় কাটাবেন?
বিশেষজ্ঞরা দুটি বিষয়ে একমত। প্রথমত, ফোবিয়া কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, এর অন্যতম কার্যকর উপায় হলো ধীরে ধীরে যে বিষয়টি ভয় লাগে, তার মুখোমুখি হওয়া।
স্টেফানি হোলের মতে, কোনো পরিস্থিতিতে সামান্য অস্বস্তি বোধ করলে নিজেকে ধীরে ধীরে সেই পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
ভ্যানেসা লোবু পরামর্শ দেন, ছোট ধাপ দিয়ে শুরু করতে। যে বিষয়টি ভয় লাগে, প্রথমে তার ছবি দেখা যেতে পারে। এরপর সে সম্পর্কে ইতিবাচক তথ্য জানা এবং ধীরে ধীরে বাস্তবে তার সংস্পর্শে যাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।
তবে ভয় যদি অত্যন্ত তীব্র হয় এবং ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে, তাহলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া ভালো।
আন্দ্রাশ জিদোর গবেষণাতেও দেখা গেছে, কোনো কিছুর সঙ্গে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি হলে শুধু পুরোনো ভয় কাটাতেই সাহায্য করে না, শুরুতেই ভয় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে।
তার মতে, ভয় বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভিজ্ঞতা যদি ইতিবাচক হয়, যেমন শৈশবে বা শিক্ষার মাধ্যমে কোনো প্রাণীর সঙ্গে ইতিবাচক পরিচয় তৈরি হয়, তাহলে সেটি ভয় তৈরির বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে।
ভ্যানেসা লোবু মনে করেন, ভয় মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়। কারণ, এটি বিপদ থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে ভয় পাওয়াই যে মানুষের নিয়তি, তা নয়।
কোনো কিছুকে ভয় পাওয়ার কারণে যদি কেউ ভীত হয়ে থাকতে না চান, তাহলে সেই ভয় কাটিয়ে ওঠার উপায় রয়েছে।
অর্থাৎ, মাকড়সা বা সাপ দেখলে ভয় পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সেই ভয় যদি জীবনযাপনে বাধা তৈরি করে, তখন সেটি ফোবিয়ার পর্যায়ে যেতে পারে। আর সঠিক পদ্ধতি ও প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তার মাধ্যমে সেই ভয় কাটিয়ে ওঠাও সম্ভব।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম