কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে চাকরির ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা। বিশেষ করে কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণদের জন্য এই পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ মেয়াদে ক্যারিয়ারে এগিয়ে থাকতে দুটি দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আইবিএমের প্রধান ট্যালেন্ট, লিডারশিপ ও কালচার কর্মকর্তা অপর্ণা নায়ার। দক্ষতা দুটি হলো—সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। সম্প্রতি সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অপর্ণা নায়ার বলেন, কর্মজীবনের শুরু থেকেই কর্মীদের নিজস্ব বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও বিচার-বিবেচনার দক্ষতা বাড়াতে হবে। কারণ, প্রযুক্তির অগ্রগতিতে অনেক কাজের ধরন ও দক্ষতার চাহিদা বদলে গেলেও এমন কিছু সক্ষমতা রয়েছে, যা মানুষের নিজস্ব চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নির্ভরশীল।
এআইয়ের যুগে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই দুই দক্ষতা
আইবিএমের এক জরিপে বিশ্বের ১ হাজার ৫০০ জন প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা এবং ৮ হাজার ৮০০ কর্মীর মতামত নেওয়া হয়। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত জরিপের ফলে দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ মানবসম্পদ কর্মকর্তা এআইয়ের যুগে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। একই মত দিয়েছেন ৪৯ শতাংশ কর্মী।
এছাড়া ৪৮ শতাংশ মানবসম্পদ কর্মকর্তা অনিশ্চয়তা ও অস্পষ্টতার মধ্যে বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তবে কর্মীদের মধ্যে মাত্র ২৯ শতাংশ এ দক্ষতার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন।
জরিপের এ ফল থেকে বোঝা যায়, এআইনির্ভর কর্মপরিবেশে নিয়োগদাতারা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নয়, বরং তথ্য বিশ্লেষণ, পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হতে পারে ঝুঁকি
এআই কাজ সহজ ও দ্রুত করতে পারলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কর্মীদের নিজস্ব দক্ষতা বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আইবিএমের জরিপে উদ্বিগ্ন কর্মীদের প্রায় চারজনের মধ্যে তিনজন জানিয়েছেন, এআই ইতোমধ্যে তাদের কিছু দক্ষতা কমিয়ে দিতে শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা। অন্যদিকে, ৫৭ শতাংশ নির্বাহী কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য এ দক্ষতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছেন জ্যাপিয়ারের ট্যালেন্ট অ্যাকুইজিশনের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক বনি ডিলবার। তার মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরোপুরি এআইয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কারণ, এতে কর্মীদের নিজস্ব জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং মৌলিক দক্ষতা গড়ে তোলার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
চাকরিপ্রার্থীরা কীভাবে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরবেন
নিয়োগদাতাদের কাছে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও বিচার-বিশ্লেষণের সক্ষমতা তুলে ধরতে চাকরিপ্রার্থীরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে পারেন।
যেমন : লিংকডইনে নিজের পেশা বা সংশ্লিষ্ট শিল্পের কোনো বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখা প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে কোনো বিষয় কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়, যুক্তি দিয়ে মতামত উপস্থাপন করা যায় কি না এবং তথ্যের যথার্থতা যাচাই করার সক্ষমতা কেমন—তা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
অপর্ণা নায়ারের মতে, সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তিগত দক্ষতার চাহিদা পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু তথ্যের মান যাচাই, যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ এবং সমালোচনামূলক চিন্তা করার ক্ষমতা দীর্ঘ মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
তাই কর্মজীবনের শুরু থেকেই নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, নিজের জ্ঞান নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং প্রযুক্তির পাশাপাশি নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। এআইকে বিকল্প চিন্তাশক্তি হিসেবে নয়, বরং নিজের দক্ষতা বাড়ানোর সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই হতে পারে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে এগিয়ে থাকার অন্যতম উপায়।